
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। চুক্তির মূল্য, কয়লার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ না কিনলেও অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে চুক্তিটিকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও একতরফা বলে সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহল।

২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার জন্য ২৫ বছর মেয়াদি পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (PPA) করে। চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।
চুক্তিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ না কিনলেও বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ, ন্যূনতম ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং চুক্তি বাতিলের জটিল শর্ত বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
২৫ বছর ধরে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’—বিদ্যুৎ না কিনেও টাকা !
চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হোক বা না হোক, কেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য বাংলাদেশকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এই ক্যাপাসিটি চার্জ বছরে প্রায় ৪৫০-৪৭০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।২৫ বছরে যার মোট পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র যদি কোনো বছর বিদ্যুতের প্রয়োজন কম থাকার কারণে আদানির কাছ থেকে কম বিদ্যুৎ নেয়, তাহলেও কেন জনগণের অর্থে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে?

আরও বিতর্কিত বিষয় হলো, চুক্তিতে বছরে অন্তত ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ নেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। বাংলাদেশ এই পরিমাণ বিদ্যুৎ না নিলে কয়লা, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ ক্ষতিপূরণের দায় তৈরি হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি থেকে বের হওয়াই কি প্রায় অসম্ভব ? চুক্তির বাতিল বা ‘এক্সিট’ ব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তিতে পক্ষগুলোর জন্য যে ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বাতিলের সুযোগ থাকার কথা, আদানি চুক্তিতে বাংলাদেশের সেই সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
একটি প্রতিবেদনে চুক্তির ধারা ৪.২(এল) বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, আদানির এমন কোনো ‘ম্যাটেরিয়াল ব্রিচ’ থাকতে হবে, যা তার চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর গুরুতর ও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সংশোধন করা হয়নি—তবেই বাংলাদেশের চুক্তি থেকে বের হওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি বাতিল করা হলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে—একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এত দীর্ঘমেয়াদি এবং আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে কেন এমন শর্ত থাকবে, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থে চুক্তি থেকে বের হওয়ার পথ এত সংকীর্ণ?
কেন এত ব্যয়বহুল হলো আদানির বিদ্যুৎ ? জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। কমিটি আদানি চুক্তিতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, কয়লার মূল্য এবং চুক্তির কাঠামো নিয়ে গুরুতর সমস্যা চিহ্নিত করেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়, আদানির বিদ্যুতের দাম অন্যান্য ভারতীয় বিদ্যুৎ আমদানির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিটি আদানি চুক্তিতে মূল্য নির্ধারণ ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছে এবং চুক্তিটি পুনঃআলোচনা বা আর্থিকভাবে ক্ষতিকর ধারাগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছে।
আরও গুরুতরভাবে, জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি চুক্তি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে। কমিটির সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
‘দেশ বিক্রির চুক্তি’—নাকি রাজনৈতিক স্লোগান ? আদানি চুক্তিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বা ‘গোলামির দাসখত’ হিসেবে অভিহিত করা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সাংবাদিকতার বিচারে এর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হবে চুক্তির ধারা, আর্থিক দায়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।
তবে এটুকু স্পষ্ট—চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য আর্থিকভাবে কতটা সুবিধাজনক ছিল, সে প্রশ্ন এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণেও চুক্তির একাধিক ধারা নিয়ে গুরুতর আপত্তি উঠে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার পারেনি—এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকার কী করবে ? চুক্তি বাতিলের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাতিল করলেই দায়মুক্তি পাওয়া যায় না। চুক্তির governing law, dispute-resolution mechanism, arbitration clause এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, আদানি চুক্তির অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্য নিয়ে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
এর আগে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিও আদানির সঙ্গে চুক্তি পুনঃআলোচনা অথবা শর্ত পরিবর্তনে সম্মতি না মিললে চুক্তি বাতিলের পথ বিবেচনার সুপারিশ করেছিল।
অর্থাৎ বিষয়টি ‘বাতিল করা যাবে কি যাবে না’—এখানেই আটকে নেই। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে চুক্তির পুনঃআলোচনা, সংশোধন কিংবা প্রয়োজন হলে আইনগতভাবে বাতিলের পথে যাবে।
শুধুআদানি বিদ্যুৎ চুক্তি আদানি নয়, আরও কত চুক্তি ?আদানির চুক্তি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে করা অন্যান্য চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রকল্প নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠছে। তবে ‘৮টি গোপন চুক্তি’সহ নির্দিষ্ট সংখ্যক চুক্তির প্রতিটি ধারা ও প্রকৃতি যাচাই না করে সেগুলোকে সরাসরি ‘দেশবিরোধী’ বা ‘গোপন দাসত্বের চুক্তি’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সমীচীন নয়।
বরং প্রতিটি চুক্তি প্রকাশ্যে এনে সংসদীয় ও আইনগত পর্যালোচনা করা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে পুনঃআলোচনা বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
জনগণের প্রশ্ন একটাই৷ : বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, প্রবাসী শ্রমিক ও দেশের করদাতাদের অর্থে রাষ্ট্রীয় কোষাগার পরিচালিত হয়। সেই অর্থে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি হলে তার প্রতিটি ধারা জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ প্রশ্ন তোলা নাগরিক অধিকার।
তাই এখন প্রশ্ন কেবল আদানি চুক্তি নিয়ে নয় : ২৫ বছরের এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায় ছিল ? কেন বিদ্যুৎ না নিলেও বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জের দায় থাকবে ? কেন ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল ? কেন চুক্তির কাঠামো নিয়ে এতদিন এত প্রশ্নের উত্তর মেলেনি?
এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— যদি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তাহলে একটি নির্বাচিত সরকার কি আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেটি বাতিল, সংশোধন কিংবা পুনঃআলোচনা করার সাহস দেখাবে?
আদানি চুক্তির জাতীয় পর্যালোচনা এখন সেই পরীক্ষারই মুখোমুখি করেছে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে। জাতীয় স্বার্থ বনাম আন্তর্জাতিক চুক্তিগত দায়—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই নিতে হবে সিদ্ধান্ত।
কারণ বিষয়টি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, চুক্তি করার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
এখন দেখার বিষয়—জনস্বার্থের নামে নেওয়া সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়, নাকি ২৫ বছরের পুরোনো চুক্তির দায়ই বাংলাদেশের ঘাড়ে বহাল থাকে।
