গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলী ঘিরে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ: সরকারি চাকরি, নাকি ডেভেলপারের ছায়া ? পরিবার, কোম্পানি ও ফ্ল্যাট ব্যবসার যোগসূত্র নিয়ে তীব্র প্রশ্ন—অভিযোগ, নাকি প্রমাণ? উত্তর খুঁজছে নথি !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলী ঘিরে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ: সরকারি চাকরি, নাকি ডেভেলপারের ছায়া ? পরিবার, কোম্পানি ও ফ্ল্যাট ব্যবসার যোগসূত্র নিয়ে তীব্র প্রশ্ন—অভিযোগ, নাকি প্রমাণ? উত্তর খুঁজছে নথি !   গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেও কয়েকজন প্রকৌশলী আবাসন ও ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত—এমন অভিযোগ ঘিরে নতুন করে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মিজান, উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু, সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আবুল বাসার, উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আব্দুর রউফ এবং সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) গুলনাহার।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির দায়িত্বের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে কিংবা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগের সত্যতা যাচাই হলে শুধু সরকারি চাকরির আচরণবিধি নয়, সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।


বিজ্ঞাপন

তবে অভিযোগই শেষ কথা নয়। বরং এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোম্পানির কাগজপত্র কী বলছে, অর্থের প্রবাহ কোথায়, আর সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা ঠিক কতটা ?


বিজ্ঞাপন

মিজানুর রহমান মিজান: পরিবারের ব্যবসায়িক যোগসূত্র কতটা গভীর ?  অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মিজান। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ‘ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিষ্ঠানটির প্রচারসামগ্রী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মিজানুর রহমানের দুই ভাই প্রতিষ্ঠানটির বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। মোহাম্মদপুরের বসিলা-ওয়াশপুর, মিরপুর-১-এর গৈলারটেক, উত্তরা দিয়াবাড়ি এবং সাভার ডিওএইচএস-নবীনগরসহ বিভিন্ন ঠিকানা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু এখানেই তদন্তের আসল জায়গা। পরিবারের কেউ একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে ওই ব্যবসার অংশীদার—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সুতরাং কোম্পানির নিবন্ধন নথি, পরিচালক বা অংশীদার তালিকা, প্রকৃত মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী এবং ব্যবসায়িক চুক্তি খতিয়ে দেখা জরুরি।

আবুল বাসার-গুলনাহার: একই পরিবারের দুই প্রকৌশলী, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ :  গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আবুল বাসারের বিরুদ্ধেও ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে আবুল বাসারের স্ত্রী সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) গুলনাহারকে ঘিরে। তাঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

এখানে তদন্তের প্রশ্ন সরাসরি—একই পরিবারের দুই সরকারি প্রকৌশলী কি কোনোভাবে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত? যুক্ত থাকলে তাঁদের ভূমিকা কী? আর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক বা মালিকানাগত কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হলে কোম্পানির মালিকানা কাঠামো, পরিচালক তালিকা, শেয়ার বা অংশীদারিত্ব, ব্যাংক লেনদেন এবং ফ্ল্যাট বিক্রির নথি সামনে আনতে হবে।
আব্দুর রউফ: সরকারি চাকরির আড়ালে ফ্ল্যাট বিক্রির অভিযোগ? উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আব্দুর রউফের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির বিষয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি নিছক পারিবারিক ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ সরকারি দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তা যদি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, বিশেষ করে সেই ব্যবসা যদি তাঁর সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের হয়, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তবে এখানেও অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন প্রত্যক্ষ প্রমাণ—লেনদেনের রেকর্ড, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, চুক্তিপত্র, কোম্পানির নথি এবং সম্পদ বিবরণী।
আনোয়ার খান আনু: সাভারে দীর্ঘদিনের অবস্থান ঘিরে নতুন প্রশ্ন
উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনুকে ঘিরে অভিযোগের ধরন কিছুটা ভিন্ন।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন সাভার গণপূর্ত ডিভিশনে কর্মরত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়ন ও জমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাভার এলাকার সরকারি জমিতে দোকানপাট ভাড়া দেওয়া বা ‘পজিশন’ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগগুলো গুরুতর হলেও এগুলোর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগগুলো কি নিছক ভিত্তিহীন প্রচারণা, নাকি এর পেছনে রয়েছে যাচাইযোগ্য নথি ও আর্থিক লেনদেন ? এই উত্তর বের করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

আচরণবিধিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন৷ :  সরকারি কর্মচারীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে প্রচলিত আচরণবিধিতে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে পাঁচ প্রকৌশলী কিংবা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ সত্য হলে প্রথমেই জানতে হবে—সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো কর্মকর্তা তাঁর সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন কি না। কারণ সরকারি পদ এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা যদি একই স্বার্থের জায়গায় এসে দাঁড়ায়, তাহলে সেখানে শুধু আচরণবিধির প্রশ্ন নয়—স্বার্থের সংঘাত, প্রভাবের অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নও সামনে আসে।

অভিযোগের পাহাড় নয়, দরকার নথির আয়না  :  এই ঘটনায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো অভিযোগকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের হাতিয়ার না বানিয়ে নথির আয়নায় দেখা। প্রথমেই যাচাই করা যেতে পারে— সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক কারা, পরিচালক, অংশীদার বা শেয়ারহোল্ডারদের তালিকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বা তাঁদের পরিবারের কারও নাম আছে কি না, কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনে তাঁদের সম্পৃক্ততা আছে কি না, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে এসব ব্যবসা বা সম্পদের তথ্য রয়েছে কি না, ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি ও অর্থ গ্রহণের নথিতে কার নাম রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রকৃতপক্ষে দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রকল্প বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িত ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই অভিযোগ আর অভিযোগ থাকবে না—তা হয় প্রমাণিত হবে, নয়তো খণ্ডিত হবে।

দায় কার—অভিযোগকারীর, নাকি তদন্তকারীর ? গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে তাতে লাভ কারও নেই। অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নির্দোষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনমনে সন্দেহ তৈরি করাও সমান অন্যায়।

তাই প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং নথিভিত্তিক অনুসন্ধান।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাগজপত্র, সরকারি রেকর্ড, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

শেষ প্রশ্ন: অভিযোগ, নাকি প্রমাণ ? এ পর্যন্ত আলোচিত অভিযোগগুলোর কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখানে নেই। তাই পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা বিষয়গুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

কিন্তু অভিযোগ গুরুতর বলেই তদন্তও হতে হবে গুরুতর।
সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা সত্যিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবাসন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন কি না, থাকলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, এবং সেই সম্পৃক্ততা তাঁর সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের জবাব এখন সময়ের দাবি।

কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতারও প্রশ্ন একটাই— অভিযোগকে কি প্রমাণে রূপ দেওয়া যাবে, নাকি নথির পরীক্ষায় অভিযোগই ভেঙে পড়বে ? উত্তর মিলবে প্রচারসামগ্রীতে নয়; মিলবে কোম্পানির নথি, সরকারি রেকর্ড, সম্পদ বিবরণী এবং অর্থের গতিপথে।

👁️ 218 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *