লোডশেডিং থেকে ‘নোবেল’—নসরুল হামিদের বিদ্যুৎ-সাম্রাজ্যের অন্ধকার অধ্যায়  ! দেশ অন্ধকারে, আর সন্দেহজনক লেনদেনে আলো ঝলমলে ৯৮ অ্যাকাউন্ট—৩,১৮১ কোটি টাকার হিসাব ঘিরে তোলপাড় !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  বিদ্যুৎ খাতে ‘অসামান্য অবদান’-এর জন্য নসরুল হামিদ বিপুকে যদি কোনোদিন নোবেল দেওয়া হয়, সেটি হয়তো বিদ্যুতের জন্য নয়—লোডশেডিংকে জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করার ‘অসামান্য কৃতিত্বের’ জন্য! ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলছেন—নোবেল কম, চকবাজার থেকে কিনে আনা কোনো ‘বিশেষ পুরস্কার’ই হয়তো তার প্রাপ্য!


বিজ্ঞাপন

কারণ ২০২২ সালে সরকার যখন ঘোষণা দিয়েছিল, দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হবে, বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই দাঁড়িয়েছিল তিন থেকে চার ঘণ্টায়। দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীনতার সেই অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে, দীর্ঘ ১৮ বছরের রাজনৈতিক শাসনামলে অন্ধকার সহ্য করার ধৈর্য নিয়েও এখন রীতিমতো রসিকতা চলে। এমনকি ২০২৬ সালের লোডশেডিং নিয়েও সামাজিক পরিসরে ব্যঙ্গের কমতি নেই—যেন অন্ধকারও এখন জাতীয় জীবনের ‘পুরোনো অভ্যাস’!

কিন্তু প্রশ্ন হলো—দেশ যখন অন্ধকারে, তখন কার কার ঘর আলোকিত হচ্ছিল ?  ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নসরুল হামিদ বিপুকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ ও দুর্নীতির অনুসন্ধান সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং সামিট ও আদানির মতো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের মাত্রা আরও গুরুতর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসা আর্থিক তথ্যকে ঘিরে। দুদকের অনুসন্ধানে নসরুল হামিদ ও সংশ্লিষ্টদের ৯৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩,১৮১ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা সামনে এসেছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার স্ত্রী সীমা হামিদ ও ছেলে জারিফ হামিদসহ তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তিনটি মামলা দায়েরের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে।

এখানেই শেষ নয়। দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে নসরুল হামিদ ও সংশ্লিষ্টদের ৭০টির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রমনা ও বনানীর চারটি ফ্ল্যাট, তিনটি গাড়ি এবং গুলশানের একটি বিলাসবহুল বহুতল ভবন ক্রোকের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে তাদের আয়কর-সংক্রান্ত নথিও।

যে রাজনীতিক একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন, তার সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ড এখন তদন্তকারী সংস্থার নথি ও আদালতের আদেশের আওতায়—রাজনীতির নির্মম পরিহাস যেন এখানেই।

বুড়িগঙ্গার তীরে ‘ক্ষমতার বাংলো’, শেষ পর্যন্ত বুলডোজারের নিচে
ক্ষমতার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তার আরেকটি আলোচিত উদাহরণ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে বুড়িগঙ্গা নদী দখল করে নির্মিত বলে অভিযোগ ওঠা বাংলো।

অভিযোগ ছিল, নদীর জায়গা দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল বিলাসবহুল স্থাপনা। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই স্থাপনার ভাগ্যে জোটে আরেক বাস্তবতা। বিআইডব্লিউটিএর উচ্ছেদ অভিযানে বুলডোজারের আঘাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় কথিত সেই অবৈধ বাংলো।

একসময় যেখানে ক্ষমতার দাপটের ছায়া ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে উচ্ছেদের স্মৃতি—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্থায়িত্ব যে কতটা ক্ষণস্থায়ী, তার যেন দৃশ্যমান প্রতীক।

অফিসে কোটি টাকা, অস্ত্র-গুলি—তদন্তে নতুন প্রশ্ন  :  সরকার পতনের পর বনানীর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানেও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার দাবি করা হয়। অভিযানে প্রায় এক কোটি টাকা নগদ, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—একজন সাবেক মন্ত্রীর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে এত বিপুল নগদ অর্থ, অস্ত্র ও গুলি কীভাবে এলো? এগুলোর বৈধ উৎস কী? কার প্রয়োজনে বা কী উদ্দেশ্যে এসব সেখানে রাখা হয়েছিল ? এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর অবশ্য তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই মিলবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়নের’ গল্পের আড়ালে অন্ধকারের হিসাব  ? নসরুল হামিদ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণী অবস্থানে ছিলেন। ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং জ্বালানি আমদানির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সেই উন্নয়নের বিপরীতে জনগণের প্রশ্নও কম নয়—বিদ্যুতের দাম কেন বাড়ল? সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন লোডশেডিং হলো? বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ল? আর বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত থেকে কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং পুরো নীতিনির্ধারণী কাঠামো, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকেও নজর দিতে হবে।

নসরুল হামিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও বাকি। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী হিসেবে অভিহিত করার সুযোগ নেই। তবে দুদকের অনুসন্ধান, মামলা, সম্পদ অবরুদ্ধ ও ক্রোকের পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তথ্য—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক কটাক্ষের পর্যায়ে নেই; বরং যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। একসময় জনগণকে বলা হয়েছিল—বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে, দেশ আলোকিত হচ্ছে।

 

আজ সেই জনগণেরই আরেকটি প্রশ্ন—দেশ যদি এত আলোয় আলোকিত হয়ে থাকে, তাহলে নসরুল হামিদের সাম্রাজ্যের হিসাবের খাতা এত অন্ধকার কেন ?  আর যদি সত্যিই ৯৮টি অ্যাকাউন্টে ৩,১৮১ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের হিসাব থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় ‘লোডশেডিং’ হয়তো বিদ্যুতে নয়—জবাবদিহির জায়গাতেই হয়েছিল।

সেই অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব এখন তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। জনগণের প্রত্যাশা একটাই—লোডশেডিংয়ের মতো দুর্নীতির ফাইল যেন আর ‘ঘোষিত এক-দুই ঘণ্টা’ থেকে বাস্তবে বছরের পর বছর স্থায়ী না হয়।

👁️ 39 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *