দুই যুগেও বদলি নেই রুহুল আমিনের  :  মিরপুর বিআরটিএতে ‘দালাল সিন্ডিকেটের’ রামরাজ্য, পুরোনো সিএনজি কেলেঙ্কারির পর নতুন অভিযোগ !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  :  বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ যেন দীর্ঘদিন ধরেই একই বলয়ের নিয়ন্ত্রণে। আর সেই বলয়ের অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ রুহুল আমিন।


বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে একই সার্কেলে কর্মরত থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরোনো অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার উঠেছে দালাল সিন্ডিকেটকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ।

 

অভিযোগ রয়েছে, গাড়ির নতুন-পুরোনো লাইসেন্স, মালিকানা বদলি ও রুট পারমিটসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন রুহুল আমিন। গত বছর সিএনজি স্ক্র্যাপ-সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িতদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসার পাশাপাশি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও ওঠে। এত অভিযোগের পরও মিরপুরের ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এ এখনো বহাল রয়েছেন তিনি।

‘একই চেয়ারে’ প্রায় দুই যুগ  :  অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এ প্রায় দুই যুগ ধরে কর্মরত রুহুল আমিন। একসময় হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে তিনি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তাঁর দায়িত্বের আওতায় থাকা বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নতুন-পুরোনো লাইসেন্স, মালিকানা বদলি ও রুট পারমিট-সংক্রান্ত কাজ।


বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ সময় একই সার্কেলে একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগ পাওয়াকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বদলি ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে একটি নির্দিষ্ট বলয়কে কেন্দ্র করে এখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

ক্ষমতার ‘ছায়া’ দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ :  রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান এবং আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন চৌধুরীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে তিনি দীর্ঘদিন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সমালোচনা সামলে নিয়েছেন। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দালাল সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষক কে ? নতুন অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি উঠে এসেছে বিআরটিএকেন্দ্রিক কথিত দালাল সিন্ডিকেটকে ঘিরে।

অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএর দালাল সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে পরিচিত মো. হারুন অর রশিদ রুবেল-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছেন রুহুল আমিন।

অভিযোগ অনুযায়ী, রুহুল আমিনের সহযোগিতায় রুবেল গাড়ির মালিকানা বদলি, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন ও রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন সেবা-সংক্রান্ত লেনদেন থেকে অর্থ আদায় করে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

‘শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার’ ঘিরে নতুন অভিযোগ : 
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের পাশে ‘শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার’ নামে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন রুবেল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিআরটিএর ভেতরে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ার পরও এই দোকানকে ঘিরেই নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছে কথিত দালাল চক্র।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা জমা নেওয়া হয় এবং প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। প্রকাশ্যে বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে দালালদের আনাগোনা কমলেও মিরপুরের বেশিরভাগ দালাল ওই দোকানের সামনে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ। এমনকি ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দালালরাও কথিত এই সিন্ডিকেটের কাছে কাজ জমা দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে ‘কাজ’ পৌঁছানোর অভিযোগ  : 
অভিযোগ অনুযায়ী, বিআরটিএ কার্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থানের সুবিধা নিয়ে সারা ঢাকার বিভিন্ন দালাল রুবেলের কাছে গাড়ি-সংক্রান্ত কাজ জমা দেন। পরে রুবেলের ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুল কাদেরের মাধ্যমে এসব কাজ রুহুল আমিনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর একই প্রক্রিয়ায় তা আবার রুবেলের কাছে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবেই অফিসের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে একটি সমান্তরাল যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে দালালদের মাধ্যমে আসা কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়।

‘ঝামেলাপূর্ণ কাজও সহজে হয়ে যায়’  :  বিআরটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্যান্য সার্কেলের কর্মকর্তারা যেসব ‘ঝামেলাপূর্ণ’ কাজ এড়িয়ে চলেন, রুহুল আমিনের কাছে সেসব কাজও নাকি সহজে সম্পন্ন হয়ে যায়। ওই কর্মকর্তার ভাষায়, তাঁর কাছে যেন এক ধরনের ‘বিশেষ ক্ষমতা’ রয়েছে।

এই ‘বিশেষ ক্ষমতা’ আসলে কী—প্রশাসনিক দক্ষতা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নাকি অন্য কোনো প্রভাব—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো নথি বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে না আসায় অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

পুরোনো সিএনজি কাণ্ডের ছায়া :  রুহুল আমিনকে ঘিরে অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সিএনজি প্রতিস্থাপনের নামে বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় রুহুল আমিন সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগও পাওয়া যায়।

গত বছর সিএনজি স্ক্র্যাপ-সংক্রান্ত অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের তালিকায়ও তাঁর নাম উঠে আসে। তখন তাঁর বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ সামনে আসে। কিন্তু একের পর এক অভিযোগ ওঠার পরও দীর্ঘ সময় একই সার্কেলে তাঁর অবস্থান অটুট থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাহলে ‘রুহুল আমিনদের’ খুঁটির জোর কোথায় ? বিআরটিএতে দালালবিরোধী অভিযান নতুন নয়। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে প্রকাশ্য দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, দালাল সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করার অভিযোগে থাকা প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—প্রতিটি সরকারের আমলেই কীভাবে একই ধরনের কর্মকর্তারা প্রভাবশালী থেকে যান ? আরও বড় প্রশ্ন, প্রায় দুই যুগ ধরে একই সার্কেলে কর্মরত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কেন কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে শুধু একজন কর্মকর্তা বা একজন দালালের দায় নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক চক্রের অস্তিত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো মিথ্যা বা ভিত্তিহীন হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

বক্তব্য মেলেনি  :  রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোনে সাড়া দেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

এখন প্রশ্ন একটাই—বিআরটিএর মিরপুর সার্কেল-১-এ দীর্ঘদিনের এই ‘স্থায়ী ব্যবস্থা’ ভাঙবে কবে? আর অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তা ও কথিত দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হবে কি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ?

👁️ 272 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *