মাগুরার অভিযোগ পেরিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দায়িত্বে নাহিদ পারভেজ : দরপত্রের আগেই কাজ, ভাউচারনির্ভর ব্যয় ও ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ; দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানের পরও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ! 

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  : রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাহিদ পারভেজকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন প্রশ্ন। মাগুরায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কাজ শুরু, ভাউচারনির্ভর ব্যয় এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে অভিযানও চালিয়েছিল : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)  :  অভিযোগের সেই অধ্যায়ের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কী সিদ্ধান্ত এসেছে—তার স্পষ্টতা না থাকলেও বর্তমানে ঢাকার শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ পারভেজ। এই বিভাগের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালিত হয়। ফলে তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং বর্তমান দায়িত্বে সরকারি প্রকল্প ও দরপত্র পরিচালনায় বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দরপত্রের আগেই কাজ—কেন ?  ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাগুরা গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন রাজস্ব কাজ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক অভিযোগ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, কয়েকটি কাজের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান, শিডিউল বিক্রি কিংবা আনুষ্ঠানিক টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবে কাজ শুরু করা হয়।


বিজ্ঞাপন

এসব প্রতিবেদনে টেন্ডার আইডি ১০৭২৭১৬, ১০৭২৭১৫, ১০৭২৭১৩ ও ১০৭২৭১১-এর মতো কয়েকটি কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনের রাস্তা ও হাঁটার পথ নির্মাণ বা সংস্কার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মেরামত, সার্কিট হাউস সংস্কার এবং বাসভবনের সীমানাপ্রাচীর-সংক্রান্ত কাজের অভিযোগও উঠে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল কয়েক লাখ টাকা থেকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত।


বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হচ্ছে, আনুষ্ঠানিক দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ শুরু করা হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক ও আর্থিক ভিত্তি কী ছিল? কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না, থাকলে তার ধরন কী ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেই কাজের বিল কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে—এসব বিষয় নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি রাখে।

শুধু গণমাধ্যমের অভিযোগ নয়, মাঠে নেমেছিল দুদক
নাহিদ পারভেজকে ঘিরে  : মাগুরার অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিষয়টি কেবল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মাগুরা গণপূর্ত বিভাগে দরপত্র আহ্বান না করে অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নামমাত্র বাস্তবায়ন করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর দুদকের ঝিনাইদহ সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।অভিযানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন কাজ সরেজমিনে পরিদর্শনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়।

অর্থাৎ, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম মাঠপর্যায়ে কাজ পরিদর্শন এবং নথি সংগ্রহ করেছিল। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ওই অভিযানের পর কী পাওয়া গিয়েছিল ? সংগৃহীত নথিতে কী ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল ? কোনো তদন্ত বা পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না ? আর হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী ?

‘নাগরিকদের ভোগান্তি’—ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য ? মাগুরার অভিযোগের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে নাহিদ পারভেজ জানিয়েছিলেন, একটি টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। নাগরিকদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে তিনি টেন্ডার সম্পন্ন হওয়ার আগেই কিছু কাজ শুরু করেছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য।

তাঁর এই বক্তব্যই এখন নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। কারণ কোনো কাজ জরুরি হওয়ায় দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজন থাকলেও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সেটি কোন প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদনের ভিত্তিতে করা হয়েছে—সেটিই মূল প্রশ্ন। জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার বিধিসম্মত কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না এবং কাজ শুরুর সময় ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।

বিশেষ করে সরকারি অর্থে পরিচালিত নির্মাণ ও সংস্কারকাজে কাজের অনুমোদন, প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ এবং বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘নাগরিকদের ভোগান্তি’ কমানোর যুক্তি থাকলেও তার সঙ্গে বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছিল, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়।

ভাউচারনির্ভর ব্যয় ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধার অভিযোগ : মাগুরা পর্বে নাহিদ পারভেজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের আরেকটি দিক ছিল ভাউচারনির্ভর ব্যয় এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। যদি কোনো সরকারি কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে বা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সেই কাজের ঠিকাদার নির্বাচন কীভাবে হয়েছে—তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে কাজের বিপরীতে প্রদত্ত বিল, ভাউচার, পরিমাপ বই, কার্যাদেশ ও অন্যান্য আর্থিক নথি পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

এখানেই দুদকের অভিযানে সংগ্রহ করা নথির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ এবং অফিসিয়াল রেকর্ড—দুইয়ের মধ্যে মিল রয়েছে কি না, সেটি যাচাই ছাড়া অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি সম্ভব নয়।

মাগুরা থেকে শেরেবাংলা নগর—গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নাহিদ পারভেজ : অভিযোগের পর মাগুরা গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্ব শেষ করে নাহিদ পারভেজের পদায়ন হয় ঢাকার শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তালিকাতেও বর্তমানে তাঁকে ওই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

এই বিভাগের দায়িত্বের পরিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ ভবনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই বিভাগে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রকল্প, সংস্কারকাজ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।

ফলে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর পূর্ববর্তী কর্মস্থলে সরকারি কাজের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযান হয়ে থাকলে, পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রশাসনিক ও আইনগত অবস্থান পরিষ্কার থাকা কতটা জরুরি—সেটিও সামনে আসে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুদকের অভিযানের ফল কী ?
দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানও নিজেই কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে কাজ পরিদর্শন ও নথি সংগ্রহ করেছে—এটি একটি যাচাইযোগ্য বিষয়।

সেই কারণে অভিযানের পরবর্তী ফলাফল, সংগৃহীত নথির মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে আসা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান কর্মস্থলে নাহিদ পারভেজের অধীনে পরিচালিত প্রকল্প ও দরপত্রগুলোর ক্ষেত্রে আগের অভিযোগের মতো কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত অডিট ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ জাতীয় সংসদ ভবনের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল সরকারি অর্থ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জনস্বার্থ। তাই মাগুরার অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে এবং বর্তমানে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ তাঁর অধীনে পরিচালিত কাজগুলো কতটা স্বচ্ছ ও বিধিসম্মত—এই দুই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নথিই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে, মাগুরার অভিযোগ ছিল নিছক প্রশাসনিক ব্যত্যয়, নাকি এর পেছনে ছিল আরও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের কোনো চিত্র।

👁️ 191 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *