!” গণপূর্তে বদলি-টেন্ডার সিন্ডিকেটের অভিযোগ  !!   ভুয়া পিএইচডি থেকে ‘বদলি বাণিজ্য’ : জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও গ্রিন কোজি কটেজ—প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক : বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন এবং একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যেন অনিয়মের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী।


বিজ্ঞাপন

 

তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার করে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। শাস্তিও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে সেই শাস্তি লঘু করা হয়। এর পর অস্বাভাবিক দ্রুততায় পদোন্নতি পেয়ে তিনি আজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু অতীতের এসব অভিযোগই নয়, ২০২৪ সালের বেইলি রোডের ভয়াবহ গ্রিন কোজি কটেজ অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম ওঠার বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার হিসেবে ওই ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সম্পৃক্ততা ছিল। ২০২৪ সালের অগ্নিকাণ্ডে ভবনটিতে ৪৬ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও ১৩ জন। অথচ এর এক বছরের মধ্যেই তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান।

 

৫ আগস্টের পরই রুটিন দায়িত্ব, এরপর ‘সিন্ডিকেট’ :  সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এরপর নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন আদায় ও ভাগবাটোয়ারা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ আনার নামে অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগে সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর নামও এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।


বিজ্ঞাপন

লটারির বদলিতেও ‘কারসাজির’ অভিযোগ : প্রকৌশলীদের বদলিতে স্বচ্ছতা আনতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে লটারির ব্যবস্থা করা হলেও সেই লটারির স্বচ্ছতাই এখন প্রশ্নের মুখে।অভিযোগকারী প্রকৌশলীদের দাবি, লটারি শুরুর আগেই পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম নির্দিষ্ট বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়। পরে সেই বাক্স থেকে নাম তুলে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে।

কারও কারও ক্ষেত্রে নিজ জেলা বা ঢাকায় পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে গণপূর্তের প্রকৌশলীরা কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা, যারা লটারির মাধ্যমে বদলির পক্ষে নন। দ্বিতীয় পক্ষ উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরা, যাদের একাংশ স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যমূলক বদলির অভিযোগ তুলেছেন।

তৃতীয় পক্ষ সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীরা—যাদের বড় একটি অংশকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকৌশলী দীর্ঘদিন পর ঢাকায় ফিরেছিলেন কিংবা মাত্র কয়েক মাস আগে বদলি হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছিলেন, তাদেরও আবার দ্রুত ঢাকার বাইরে পাঠানোর ঘটনায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

ঢাকার বাক্সে’ কারা, প্রশ্ন প্রকৌশলীদের : অভিযোগ অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিভাগের জন্য ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে দুটি আলাদা লটারির বাক্স রাখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা জেলার বাক্সে দেশের অন্যান্য এলাকার কর্মকর্তাদের নাম কীভাবে যুক্ত হলো ?

অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির আগে সিভিল বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের মধ্যে ৪১ জনের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে যুক্ত করা হয়। ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ঢাকার বাক্সে নেওয়া হয়েছে এবং পরে তাদেরই নাম তুলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক প্রকৌশলী। তাদের দাবি, পছন্দের পোস্টিং নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে।

একের পর এক পদায়নে প্রশ্ন : বদলি-পদায়নের তালিকায় কয়েকজন কর্মকর্তার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী প্রকৌশলীরা।

আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে, গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগে এবং ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি করা হয়।

এ এস এম সাখওয়াত ইসলামকে মিরপুর উপবিভাগে পদায়ন করা হয়। এর আগে তিনি রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ ও শেরে-বাংলা উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল গণপূর্ত উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩ এবং মহাখালী উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করার পর ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে পদায়ন পান।

অন্যদিকে, জয় চৌধুরীর নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে উঠলেও নিজ জেলার অজুহাতে লটারি পরিবর্তন করে তাকে অন্যত্র বদলি করার অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে যথাক্রমে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ ও রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন দেওয়া হয়। এর আগে মেহবুবুর রহমান ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হককে যথাক্রমে চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম একই লটারিতে ফরিদপুর ও নরসিংদী—দুই জেলার আওতায় ওঠার ঘটনাও প্রশ্ন তুলেছে।

চাকরিজীবনে কখনো ঢাকার বাইরে দায়িত্ব পালন না করা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদকে উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩ ও ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) হয়ে তেজগাঁও উপবিভাগে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। মো. মামুনুর রশিদের নিজ জেলা রংপুর।

তিনি পাঁচ বছরের বেশি সময় সাভার গণপূর্ত উপবিভাগে কর্মরত ছিলেন। মাঝে চট্টগ্রামে বদলি হলেও এক বছর না ঘুরতেই গাজীপুরে পদায়ন পান। পরে লটারির প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আবার ঢাকার উপবিভাগে পদায়ন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে স্থানান্তর করা হয় এবং পরে শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

সাত প্রকৌশলী লটারির বাইরে কেন ?  অভিযোগ রয়েছে, আরও সাতজন প্রকৌশলীকে কোনো লটারির আওতায় আনা হয়নি। তাদের মধ্যে তিনজন সিভিল এবং চারজন ই/এম বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী। এ ঘটনায় বদলি প্রক্রিয়ার নীতিমালা ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলিতে নিজ জেলা বাদ দিয়ে নিজ নিজ প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের অপেক্ষাকৃত কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে পাঠানোর বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং এড়িয়ে চলার কথা।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে আগে থেকেই নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে ঢোকানো হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। সেখানে লটারি স্বচ্ছ না হওয়া, অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ তুলে বদলি প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।

৬৫ কর্মকর্তার বদলিতে কোটি টাকার লেনদেন ?  সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনে একদিনেই অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলির আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করার অভিযোগ ওঠে।

একই সঙ্গে বদলির প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়াগত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জানা গেছে, এ ঘটনায় খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী ব্যাখ্যা চান।

তার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশই বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ভুয়া পিএইচডি সনদ  : তদন্তে প্রমাণ, তারপরও দ্রুত পদোন্নতি : খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহারের অভিযোগটি পুরোনো হলেও তার ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের জন্য ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার তাকে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের লঘুদণ্ড দেন বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর প্রভাব ও সুপারিশ তার শাস্তি লঘু হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। খালেকুজ্জামান তাকে ‘ফুফু’ বলে ডাকতেন বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং পরবর্তী পাঁচ মাসের মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে দুই দফা পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দেয়।

পরে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ পরিবার হিসেবে পরিচিত হওয়ার অভিযোগ থাকা অবস্থায় তিনি গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান।

১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায়, পদোন্নতির সময় দেশে : তার চাকরিজীবন নিয়েও রয়েছে বিস্ময়কর তথ্য। ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগ নিয়ে প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলে তিনি দেশে ফিরে আসতেন। বিভাগীয় মামলা ও শাস্তির পরও দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনাকে তাই স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

পাঁচ জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলী ?  ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার অবস্থানেও পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সাবেক গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের হাত ধরে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।

অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার অবস্থান ছিল তিন নম্বরে। এরপরও পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম এক নম্বরে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ‘জুলাই হত্যা মামলা’ ? খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর আরেকটি হলো, প্রধান প্রকৌশলীর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলা ব্যবহার করার চেষ্টা।

অভিযোগকারী জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের দাবি, রামপুরা থানার একটি মামলায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয় এবং পরে সেই মামলার নথি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, মামলার নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রামের বাড়িতেও পাঠানো হয়, যাতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামের তালিকা পাঠানো হয়।

অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দের নামের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অবস্থান ছিল তৃতীয়।

অথচ ওই তালিকায় নিজের নাম প্রথমে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় মো. শহিদুল আলম এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারের নামও ছিল। এ নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

গ্রিন কোজি কটেজ  : ৪৬ প্রাণের মৃত্যু, নকশা অনুমোদনে ছিলেন খালেকুজ্জামান : ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। আহত ও দগ্ধ হন আরও ১৩ জন। সাততলা ওই বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন ও ব্যবহার নিয়ে পরবর্তীতে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০১১ সালে রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার হিসেবে ভবনটির নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন।

তদন্তে ভবনটিতে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকা এবং অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়ও উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে নিজের সম্পৃক্ততা যেন গুরুত্ব না পায়, সে জন্য তিনি বিভিন্নভাবে তদবির করেন। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর না পেরোতেই ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান।

এক প্রকল্পে একাধিক প্যাকেজ, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ : প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শুধু বদলি বা পদোন্নতি নয়, অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থের বিল উত্তোলন, কাজ না করেই বিল প্রদান, টেন্ডার কমিশন আদায় এবং অর্থ ভাগবাটোয়ারার মতো ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিতর্কিত নারীঘটিত ঘটনা, ব্ল্যাকমেইল, দলীয় পরিচয় ও দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বরং সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অপসারিত কর্মকর্তাদের পুনর্বহালে প্রধান প্রকৌশলী নানা কৌশল নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাংবাদিকদের প্রবেশেও কড়াকড়ি : অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের অভিযোগও উঠেছে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গণমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত করে দিয়ে অধিদপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের পৃথক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কোনো অনিয়ম হয়নি’, দাবি খালেকুজ্জামানের : অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণমাধ্যম কে বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীরা। তাদের লটারির মাধ্যমে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি করা হবে। অন্য জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী মনে করে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার কোনো প্রতিযোগী নেই।”

যা বলছে মন্ত্রণালয়  :  গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না—এ কথা বলার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে এবং বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন গত বছর।

তালিকা অনুযায়ী তিনি তিন নম্বরে রয়েছেন এবং তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আছেন। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য গ্রেড-১ হওয়ার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করতে বিষয়টি এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী যিনি যোগ্য হবেন, তাকেই প্রধান প্রকৌশলী করা হবে।

প্রশ্ন এখন একটাই  : গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা একজন প্রকৌশলীকে ঘিরে যদি ভুয়া সনদ, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, দ্রুত পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, প্রকল্পের অতিরিক্ত বিল, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা অনুমোদন নিয়ে একের পর এক অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। বিশেষ করে বদলি-পদায়নের লটারি, ৬৫ কর্মকর্তার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির প্রক্রিয়া, ভুয়া পিএইচডি সনদ-সংক্রান্ত বিভাগীয় তদন্ত এবং গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনের নথি—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তই পারে অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসত্যতা নিশ্চিত করতে।

কারণ অভিযোগগুলো কেবল একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়; এগুলো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, বদলি-পদায়ন ব্যবস্থা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

👁️ 247 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *