
আরাফাত হোসেন নন্দীগ্রাম (বগুড়া) : একজন সরকারি কর্মকর্তা শুধু দায়িত্ব পালন করেন না কখনো কখনো তিনি হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের আস্থা, ভরসা ও ভালোবাসার ঠিকানা। অফিসের দরজা পেরিয়ে যখন কোনো কর্মকর্তা মানুষের সুখ-দুঃখ, অভিযোগ ও প্রত্যাশার কথা মন দিয়ে শোনেন এবং সাধ্যমতো সমাধানের চেষ্টা করেন, তখন তার পদমর্যাদার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তার মানবিক পরিচয়। বগুড়ার নন্দীগ্রামে তেমনই এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রোহান সরকার।

২০২৪ সালের ৬ জুন নন্দীগ্রাম উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ব্যাচের এই কর্মকর্তা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সাধারণ মানুষের জন্য ভূমিসেবা সহজ করা, হয়রানি ও ভোগান্তি কমানো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং দ্রুততার সঙ্গে ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তার কর্মদক্ষতার বড় স্বীকৃতিও আসে দায়িত্ব পালনকালে। মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল ভূমিসেবা নিশ্চিত করা, দ্রুততম সময়ে নামজারি (খারিজ) নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে কার্যকর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালে তিনি রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন।

এই অর্জন শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, নন্দীগ্রামের ভূমিসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তনেরও স্বীকৃতি বলে মনে করেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতারা।

নন্দীগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে রোহান সরকার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বের পরিধি বাড়লেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সেবার মান ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত ছিল।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বাজার মনিটরিং, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা আরও সহজ ও হাতের নাগালে আনতে নন্দীগ্রাম পুরাতন বাজারে নবস্থাপিত ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রও নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করেন তিনি। জমি, নামজারি কিংবা অন্যান্য ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে অযথা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
একসময় অনেকের কাছে ভূমি অফিস মানেই ছিল ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ধরনের শঙ্কার জায়গা। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, দ্রুত নিষ্পত্তি এবং নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে সেই ধারণা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন রোহান সরকার।
সরকারি চাকরিতে পদায়ন ও বদলি স্বাভাবিক নিয়ম। একজন কর্মকর্তা এক কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন শেষে অন্যত্র চলে যাবেন এটাই প্রশাসনের নিয়ম। কিন্তু দায়িত্বের চেয়ার ছেড়ে চলে গেলেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
রোহান সরকারের নন্দীগ্রাম অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পুরস্কার বা প্রশাসনিক স্বীকৃতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা।
ভূমিসেবা নিতে আসা মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা, নামজারি নিয়ে সমস্যায় পড়া নাগরিকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা, বাজারে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া, খাস জমি ও খাস পুকুর অবৈধ দখল হতে উদ্ধার, সাধারণ ও সংস্থার ভূমি উন্নয়ন কর ও ভিপি লীজমানি শতভাগ আদায়, নন্দীগ্রাম হাট পেরিফেরিভুক্তকরণ এসব কাজের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত ও আস্থার কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন তিনি।
তার কর্মকালকে ঘিরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে সেবার নানা গল্প। ফলে দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হওয়ার সময়টুকু অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে আবেগের। কারণ, একজন কর্মকর্তা বদলি হয়ে যেতে পারেন, পদ পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজের স্মৃতি বদলি হয় না।
নন্দীগ্রামের মানুষ হয়তো একদিন ভুলে যাবে ভূমি অফিসে তার চেয়ারটি কোথায় ছিল। কিন্তু ভূমিসেবা নিতে গিয়ে পাওয়া সহযোগিতা, হয়রানি থেকে মুক্তির স্বস্তি কিংবা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া একটি আবেদনের স্মৃতি অনেকের কাছেই থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
এদিকে রোহান সরকার পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। নন্দীগ্রামে সাধারণ মানুষের সেবায় অর্জিত অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা নিয়ে এবার তিনি জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে নতুন অধ্যায় শুরু করছেন।
নতুন কর্মস্থলে তার দায়িত্বের পরিধি আরও বড় হবে, সামনে আসবে নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন মানুষ ও নতুন কর্মপরিসর। তবে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে তিনি থেকে যাবেন সেই কর্মকর্তা হিসেবে যার দরজা থেকে সেবা নিতে এসে কাউকে খালি হাতে বা অবহেলায় ফিরতে হয়নি।
