বাকেরগঞ্জে ভুয়া মাস্টার রোলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ  :  প্রমাণিত ‘অসদাচরণ-দুর্নীতি’, তবু বরখাস্ত নয় যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা—দুই ধাপ বেতন অবনমনেই শাস্তি

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় প্রশাসনিক সংবাদ বরিশাল বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিতিনিধি (বরিশাল)  :  বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের সঞ্চয়ের অর্থের ওপর জমা হওয়া সুদের টাকা ভুয়া মাস্টার রোল তৈরি করে উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’—দুই অভিযোগই সত্য বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। এমনকি অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে প্রাথমিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।


বিজ্ঞাপন

তবে শেষ পর্যন্ত বরখাস্ত করা হয়নি। অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড হিসেবে তার বর্তমান বেতন গ্রেডের নিম্নতর দুই ধাপে অবনমিতকরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন বরখাস্তের পরিবর্তে লঘুদণ্ড দেওয়া হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রজ্ঞাপনটি স্বাক্ষর করেছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মাহবুব আলম।


বিজ্ঞাপন

তদন্তে সুবিধাভোগীদের ‘না পাওয়ার’ তথ্য  :  মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জনাব মোঃ দেলোয়ার হোসাইন, সহকারী পরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বর্তমানে ঝালকাঠি জেলা কার্যালয়ে কর্মরত। এর আগে তিনি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ওই সময় বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের সঞ্চয়ের অর্থের ওপর ৮,৫৪,০০৬.৮০ টাকা সুদ জমা হয়।


বিজ্ঞাপন

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সুবিধাভোগীকে ৯২০ টাকা করে ওই সুদের অর্থ দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি করে একটি মাস্টার রোল তদন্ত কমিটির কাছে দাখিল করেন দেলোয়ার হোসাইন। পরে মাস্টার রোলে থাকা তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এরপর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গঠন করে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। কমিটি অভিযুক্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে দৈবচয়নভিত্তিতে কয়েকজন সুবিধাভোগীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে অর্থ পাওয়ার বিষয়টি যাচাই করে।

তদন্ত কমিটির কাছে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা জানান, তারা ওই অর্থ পাননি। ফলে দেলোয়ার হোসাইনের দাখিল করা মাস্টার রোলে উল্লেখিত তথ্য সঠিক নয় বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়।

‘নিজেই মাস্টার রোল তৈরি, পরে অর্থ উত্তোলন’ :  প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজেই ওই মাস্টার রোল প্রস্তুত করেন এবং সেই মাস্টার রোলের ভিত্তিতে ৮,৫৪,০০৬.৮০ টাকা উত্তোলন করেন।
তদন্ত নথির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। তার এমন কার্যক্রমে স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেলোয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তিনি লিখিত জবাব দেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যক্তিগত শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য ও দাখিল করা নথিপত্র পর্যালোচনার পর অভিযোগগুলো অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পরে বিধি অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘সত্য’  :  তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, দেলোয়ার হোসাইন—যিনি ওই সময় বাকেরগঞ্জের উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ছিলেন—মাস্টার রোল প্রস্তুত করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন এবং ১০ সদস্যের তদন্তকারী কমিটির কাছে ভুয়া মাস্টার রোল দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উত্তোলিত অর্থ দীর্ঘ সময় পর এবং তদন্তের প্রেক্ষাপটে জমা দেওয়ায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিপ্রায় প্রতীয়মান হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে মর্মে মতামত দেন।

বরখাস্তের সিদ্ধান্ত থেকেও শেষ পর্যন্ত সরে আসা  :  অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী যথাক্রমে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’-এর অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।

এর ভিত্তিতে একই বিধিমালার বিধি ৪(৩)(ঘ) অনুযায়ী ‘চাকরি হতে বরখাস্তকরণ (Dismissal from Service)’ গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী তাকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়।

দেলোয়ার হোসাইন দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেন। কিন্তু তার জবাব, তদন্ত প্রতিবেদন, ব্যক্তিগত শুনানির বক্তব্য এবং বিভাগীয় মামলার অন্যান্য নথিপত্র পর্যালোচনার পর মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়—অভিযোগ খণ্ডনের পক্ষে তিনি সন্তোষজনক কোনো যুক্তি বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
বিশেষ করে সুবিধাভোগীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং তদন্তে দাখিল করা মাস্টার রোলের সত্যতা যাচাইয়ের ফলাফল তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রতীয়মান করেছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে বরখাস্ত নয় কেন ?  প্রজ্ঞাপনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেলোয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি দণ্ড পাওয়ার যোগ্য। তবে বিভাগীয় মামলার সার্বিক বিষয়, তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার লিখিত জবাব, ব্যক্তিগত শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্র বিবেচনায় চাকরি থেকে বরখাস্তের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড দেওয়া সমীচীন বলে বিবেচিত হয়েছে।

এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৪(২)(ঘ) অনুযায়ী দেলোয়ার হোসাইনকে তার বর্তমান আহরিত বেতন গ্রেডের নিম্নতর দুই ধাপে অবনমিতকরণ করা হয়।
আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার দাবি—‘আমার কোনো শাস্তি হয়নি’ :  এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক দেলোয়ার হোসাইনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, “আমার কোনো শাস্তি হয়নি, এটা মিথ্যা কথা।”

তবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে তার বিরুদ্ধে বেতন গ্রেডের নিম্নতর দুই ধাপে অবনমিতকরণ দণ্ড দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের নজর প্রয়োজন

সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া, ভুয়া মাস্টার রোলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা এবং একই সঙ্গে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন বরখাস্তের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে অভিযোগের পরিমাণ, সুবিধাভোগীদের অর্থ না পাওয়ার তদন্ত-ফল, ভুয়া মাস্টার রোল দাখিলের অভিযোগ এবং তদন্ত কর্মকর্তার সুস্পষ্ট মতামতের পর শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে কোন কোন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা জনসম্মুখে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় বিষয়টি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর অনিয়মে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বিবেচনা কাজ করেছে কি না, এবং ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও বিভাগীয় কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।

👁️ 22 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *