
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর ঢাকা আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউসে কর্মরত সহকারী কমিশনার মো. আসিফ আহমেদ অনিককে ঘিরে ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং কথিত দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কাস্টমস কার্যক্রমে অনৈতিক অর্থের দাবি, পণ্য খালাসে জটিলতা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি অনুসন্ধানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের কথা জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ, সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কেন্দ্র করে অনিকের সঙ্গে একটি কথিত দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। আমদানি করা পণ্য খালাস এবং কাস্টমস-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে ওই চক্রের মাধ্যমে অনৈতিক অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল বা পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি করা হয়। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

‘টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকে’—ব্যবসায়ীদের অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা নিয়ম অনুযায়ী সরকারকে রাজস্ব দিতে আগ্রহী। কিন্তু কাস্টমস কার্যক্রমে অনৈতিক অর্থের দাবি করা হলে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন।’ ওই ব্যবসায়ীর দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, সরকারি রাজস্ব আদায়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন
আরেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, আইসিডিতে কোনো পণ্য আটকে থাকলে বিভিন্ন পর্যায়ে অনৈতিক অর্থ দেওয়ার চাপ তৈরি করা হয়।
তাঁর দাবি, পণ্য খালাসের প্রক্রিয়াকে জটিল করে পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ওই ব্যবসায়ী আরও অভিযোগ করেন, এ কাজে একটি কথিত দালালচক্র যুক্ত রয়েছে এবং সহকারী কমিশনার অনিক নিজেই তাঁদের সঙ্গে রেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, কাস্টমসের বিভিন্ন কার্যক্রমে কথিত এই চক্র প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন : সহকারী কমিশনার মো. আসিফ আহমেদ অনিকের কথিত সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, অনিকের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে, যার একটি অংশ ঘুষের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। বিশেষ করে ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জে তাঁর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান ও যাচাই প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের বিবরণ এবং কাস্টমস কার্যক্রমের রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪০তম বিসিএসের কর্মকর্তা অনিক : মো. আসিফ আহমেদ অনিক ৪০তম বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৬ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গেজেটে তাঁর যোগদানের তারিখ ৪ ডিসেম্বর ২০২২ উল্লেখ থাকলেও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁর যোগদান ৬ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে কার্যকর করা হয় বলে জানা গেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি : উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সহকারী কমিশনার মো. আসিফ আহমেদ অনিকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর লিখিত বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
তদন্তের আওতায় আনার দাবি : ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঢাকা আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা কিংবা কথিত দালালচক্রের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা কেবল অভিযোগ হিসেবে ফেলে না রেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন, পণ্য খালাসের রেকর্ড, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য এবং দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য : তাঁরা নিয়ম অনুযায়ী সরকারকে রাজস্ব দিতে চান এবং কাস্টমস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চান। একই সঙ্গে সহকারী কমিশনার মো. আসিফ আহমেদ অনিকের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, কথিত দালালচক্রের ভূমিকা এবং তাঁর সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের দৃষ্টি আকর্ষণ : অভিযোগকারীরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও তদন্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে তাঁরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রয়োজনে কাস্টমসের নথিপত্র, পণ্য খালাসের রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব যাচাই করে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হোক।
অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তা স্পষ্ট করার মাধ্যমেই কেবল কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসের কার্যক্রমে আস্থা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
