
নিজস্ব প্রতিবেদক, (ময়মনসিংহ) : ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির, অনিয়ম-দুর্নীতি, জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায় এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ ও বিনিয়োগ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থানের সুযোগ নিয়ে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং নিজের কথামতো কাজ না করলে হয়রানি বা ক্ষতির মুখে ফেলার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে তাকে নিয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কোন প্রভাবের কারণে এত অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন খাদ্য পরিদর্শক কামাল? তার ‘খুঁটির জোর’ই বা কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, যানবাহনের নিবন্ধন এবং চাকরিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ছাত্ররাজনীতি থেকে খাদ্য বিভাগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
গফরগাঁওয়ের রাজনৈতিক নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি হিসাম ও আরিফের কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া গফরগাঁও সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাজুর সময়ে তিনি নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন
১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গফরগাঁওয়ে বিএনপির জনসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও কামাল ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে নেতাদের তদবিরে উপজেলা এলএসডি হিসেবে বদলি নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তার ছবি তোলা এবং অফিসের দায়িত্ব ফেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রয়াত সংসদ সদস্যের তদবিরে চাকরি—নথি যাচাইয়ের দাবি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গফরগাঁওয়ের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের তদবিরে ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খাদ্য বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন কামাল—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে তার নিয়োগ কীভাবে হয়েছিল, নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো তদবির ছিল কি না এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে কী তথ্য রয়েছে—তা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং ঠিকাদারি সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তার কথামতো কাজ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে হয়রানি কিংবা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে বদলি৷ : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২০ সালের জুলাইয়ে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডি থেকে কামালকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা খাদ্য দপ্তরে পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন বলে জানা গেছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বদলি, প্রত্যাহার ও ডেপুটেশন সংক্রান্ত সরকারি আদেশ এবং নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ : কামালের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো নামে-বেনামে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বিনিয়োগ গড়ে তোলা।
একাধিক সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ নগরীর মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার ৭সি নম্বরের একটি ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ায় মাদ্রাসার পাশের একটি ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকান, কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ফাউন্ডেশনের চারতলা ভবন এবং নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং রয়েছে।
এছাড়া গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক দোকান থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস এলাকায় এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা জমিতে কামালের তিনটি শেয়ার রয়েছে।

তবে এসব সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয়ের সময়, অর্থের উৎস এবং প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, রেজিস্ট্রি নথি, কর নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করা জরুরি।
অন্যের নামে গাড়ি, ব্যবহার কামালের ? ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, কে নিয়মিত ব্যবহার করেন এবং গাড়ি কেনার অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্য, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র ও আর্থিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বজনদের নামেও বিনিয়োগের অভিযোগ : শুধু নিজের নামে নয়, স্বজনদের নামেও সম্পদ ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ করার অভিযোগ উঠেছে কামালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং শ্যালক ফাহিমের নামে বিভিন্ন জায়গায় জমি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে রাতে জুয়ার আসর ?কামালের বিরুদ্ধে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা সুলতান।
তার অভিযোগ, নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে গেন্দু মিয়ার হোটেলের পাশে ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে রাতে জুয়ার আসর বসে। ওই আসরে কামাল একজন ‘বিডার’ হিসেবে অংশ নিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনের কার্যালয়ে এমন কর্মকাণ্ড কীভাবে চলে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সম্পদের হিসাব তদন্তের দাবি৷ : ময়মনসিংহের বিএনপি নেতা শামছুল হক বলেন, মাজহারুল ইসলাম কামাল একসময় কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে তারা জানেন। চাকরিতে যোগদানের আগে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কী ছিল এবং বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ কত—এসব বিষয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কামালের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানান তিনি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী ? অভিযোগগুলোর বিষয়ে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়গুলো খোঁজ নিয়ে দেখব।” ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) সনজীদা শরমিন জানান, “বিষয়টি নিয়ে একটু ডিজি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। কোনো অভিযোগ আসলে তারাই দেখবে।”
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুঃ জসীম উদ্দিন খানকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি মুঠোফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্তেই মিলতে পারে উত্তর : খাদ্য বিভাগের একজন পরিদর্শক দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে অবস্থান করে বদলি-পদায়ন ও ঠিকাদারি বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন কি না, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুবিধা পেয়েছেন কি না, অভিযোগ অনুযায়ী তার ও স্বজনদের নামে বিপুল সম্পদের উৎস কী এবং জুয়ার আসরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
ফলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নজর দেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, কামালের চাকরিসংক্রান্ত নথি, বদলি-পদায়ন, ডেপুটেশন, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং কথিত সম্পদের মালিকানা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার করার দাবি তাদের।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—এত অভিযোগের পরও খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন? তার পেছনে কার প্রভাব কাজ করছে, নাকি অভিযোগগুলোর অধিকাংশই ভিত্তিহীন—এর উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্তেই।
