বিআইডব্লিউটিএর মেগা প্রকল্পে পাইলিং কেলেঙ্কারির অভিযোগ : ৫০০ মিমির বদলে ৩০০, ৪০.৫০ মিটারের স্থলে ২৩ মিটার! ১০ রডের জায়গায় ৭—নকশা বদলে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

 

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ মোল্লা।


বিজ্ঞাপন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক  : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি মেগা প্রকল্পের পাইলিং কাজে গুরুতর অনিয়ম, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়, স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ মোল্লা এবং মূল ঠিকাদার আরশাদ পারভেজ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত কার্যাদেশ ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ না করে পাইলিংয়ের ব্যাস, দৈর্ঘ্য ও রডের সংখ্যা কমিয়ে কাজ করা হয়েছে।

এতে একদিকে প্রকল্পের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে কম কাজ করে বেশি বিল তুলে নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রকল্পের অফিসিয়াল কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট পাইলিংয়ের ব্যাস (Dia) ৫০০ মিলিমিটার, দৈর্ঘ্য ৪০.৫০ মিটার এবং ১৬ মিলিমিটার ব্যাসের ১০টি রড ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিল।

কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রাপ্ত তথ্যে অভিযোগ করা হয়েছে, বাস্তবে ৫০০ মিলিমিটার ব্যাসের পরিবর্তে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার ব্যাস এবং ৪০.৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পরিবর্তে মাত্র ২৩ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইলিং করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ১০টি রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ৭টি রড।


বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, কার্যাদেশে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে বাস্তব কাজের বড় ধরনের গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সত্য হলে শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।


বিজ্ঞাপন

অনুমোদিত নকশা পাশ কাটিয়ে ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িং ! অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, মূল অনুমোদিত ডিজাইন ও কার্যাদেশ অনুসরণ না করে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লা সাইটে ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ নামে নিজস্বভাবে প্রস্তুত দুটি বিকল্প ড্রয়িং ব্যবহার করছেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই সংশোধিত ড্রয়িং কে প্রস্তুত করেছেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং মূল নকশা পরিবর্তনের আগে যথাযথ প্রকৌশলগত যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেটিং নেওয়া হয়েছিল কি না ? প্রকল্পের নকশা ও স্পেসিফিকেশনে পরিবর্তন আনা হয়ে থাকলে তার লিখিত অনুমোদন, সংশোধিত ডিজাইন, ভেটিং নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপত্র প্রকল্পের নথিতে থাকার কথা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই।

কম কাজ, অথচ বিল নিয়ে প্রশ্ন : অভিযোগ রয়েছে, পাইলিংয়ের উপকরণের ব্যবহার কম দেখিয়ে কিংবা প্রকৃত কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে ভুয়া মাপবই (MB) ও রানিং বিল প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব বিলের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার আরশাদ পারভেজ আনুপাতিক হারে অর্থ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের মূল কার্যাদেশ, BOQ, মাপবই, রানিং বিল, পেমেন্ট ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, পাইলিংয়ের দৈর্ঘ্য ও ব্যাসের বাস্তব পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট টেস্ট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’-কে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অভিযোগ : প্রকল্পের পাইলিংয়ের রডের কাজ নিয়মবহির্ভূতভাবে ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সরকারি প্রকল্পে মূল ঠিকাদার কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত, টেন্ডার ডকুমেন্ট এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সম্মতি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মূল ঠিকাদারের সম্পর্ক কী, সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অনুমোদন ছিল কি না এবং প্রকল্প পরিচালক এ বিষয়ে কী ভূমিকা রেখেছেন—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক পাঠানো ঠিকাদারি লাইসেন্সটির সঙ্গে কথিত সাব-কন্ট্রাক্টের মূল সম্পর্ক কী—তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, নীরব কর্মকর্তারা
বিআইডব্লিউটিএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার এবং ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই কথা বলতে সাহস পাননি।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প পরিচালক বাইরে থেকে এসে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের কাজের চেয়ে অর্থ ভাগাভাগির বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমনকি প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে কোনো সাংবাদিক তথ্য জানতে চাইলে বা প্রশ্ন তুললে তাকে কথিত ভাড়াটে ক্যাডার দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে, যাতে অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে না আসে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অর্থ ভাগাভাগির এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি  :  অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে— কার্যাদেশে নির্ধারিত ৫০০ মিলিমিটার ব্যাস ও ৪০.৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পরিবর্তে ৩০০ মিলিমিটার ব্যাস ও ২৩ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল কোন যুক্তি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে করা হলো ? নির্ধারিত ১০টি রডের পরিবর্তে ৭টি রড ব্যবহারের অনুমোদন কে দিয়েছেন ? ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িংয়ের প্রস্তুতকারক কে এবং এর অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষই বা কে ? মূল নকশা পরিবর্তনের ভেটিং নথি ও সংশোধিত অনুমোদনের কাগজপত্র কোথায় ? প্রকৃত কাজের পরিমাণ কম হলে তার বিপরীতে পূর্ণ বিল কীভাবে প্রস্তুত ও পরিশোধ করা হলো ? ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’-কে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিসম্মত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না ? এবং প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক পাঠানো ঠিকাদারি লাইসেন্সটির সঙ্গে কথিত সাব-কন্ট্রাক্টের মূল সম্পর্ক কী ?

পাইলিংয়ে অনিয়ম হলে ঝুঁকি শুধু অর্থের নয়৷  :  প্রকৌশলসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো স্থাপনার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাইলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত নকশা, ব্যাস, দৈর্ঘ্য, রডের সংখ্যা কিংবা অন্যান্য প্রকৌশলগত স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করা হলে তার যথাযথ প্রকৌশলগত অনুমোদন থাকা অপরিহার্য।

ফলে অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে পাইলিং করা হয়ে থাকলে বিষয়টি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় বা আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কাঠামোগত নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তের আওতায় মূল কার্যাদেশ, অনুমোদিত ড্রয়িং, BOQ, সংশোধিত ড্রয়িং, ভেটিং নথি, মাপবই, রানিং বিল, পেমেন্ট রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, পাইলিংয়ের বাস্তব পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট টেস্ট রিপোর্ট যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি৷ : অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ প্রতিবেদনে তার বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বা সংশ্লিষ্ট অন্যদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ও সদস্য (প্রকৌশল)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে— প্রকল্পটির অনুমোদিত নকশা ও কার্যাদেশের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল, কথিত বিকল্প ড্রয়িংয়ের বৈধতা, পাইলিংয়ের প্রকৃত পরিমাপ, মাপবই ও বিলের যথার্থতা এবং কথিত সাব-কন্ট্রাক্টের বৈধতা জরুরি ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।

👁️ 28 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *