ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, আগে যেখানে একটি স্থানে ১৫টি টিনের ঘর ছিল, সেখানে এখন গা ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে ২০টি ইটের ঘর। অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী পুনর্নির্মাণের নামে বস্তির ভেতরের গলি ও চলাচলের পথগুলো আরও সরু হয়ে পড়েছে। ফলে বাহ্যিকভাবে ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও বাস্তবতায় ঘর সংখ্যা বৃদ্ধি ও ইটের দালানে রূপান্তর বস্তির আবাসন ব্যবস্থার ওপর এক অদ্ভুত প্রশ্ন তৈরি করেছে—এই আগুন কি তবে বাসিন্দাদের জন্য ক্ষতিকর ছিল, নাকি সুযোগ এনে দিয়েছে লাভজনক এক নতুন হিসাবের?
বস্তির কয়েকজন নতুন ও পুরনো বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগুন লাগার পর ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা যেমন এসেছে, তেমনই এক শ্রেণির প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় শুরু হয় রাতারাতি স্থায়ী ও পাকা কাঠামো তৈরির প্রতিযোগিতা। সর্বস্ব হারানোর দাবি করা অনেক ঘর মালিকই অগ্নিকাণ্ডের সুযোগে টিন সরিয়ে একাধিক তলা বা পাকা ইটের রুম তুলে ফেলেন।
তবে এই নতুন পরিবর্তন নিয়ে মারাত্মক আতঙ্কে রয়েছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের ভাড়াটিয়া বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কড়াইল বস্তির এক ভাড়াটিয়া বাসিন্দা ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “সর্বস্ব হারানো নিয়ে তখন অনেক কান্নাকাটি দেখেছি। কিন্তু এখন যে হারে ইটের দালান তোলা হয়েছে, তাতে মনে হয় আগুন লেগে লাভই হলো। তবে আমাদের মতো ভাড়াটিয়াদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আগে তাও টিন কেটে বা বেড়া ভেঙে বের হওয়া যেত, এখন যেভাবে ঘিঞ্জি করে ইটের দালান বানানো হয়েছে, তাতে পুনরায় আগুন লাগলে বস্তি থেকে প্রাণ নিয়ে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
নগর ও আবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে পুনর্নির্মাণ এবং সরকারি-বেসরকারি জায়গায় অবৈধভাবে পাকা কাঠামো গড়ে তোলা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এলাকাভিত্তিক উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত এক ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা জানান, “কড়াইলের মতো সংবেদনশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একবার আগুন লাগলে সরু গলির কারণে গাড়ি প্রবেশ করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইটের স্থায়ী দালান গড়ে ওঠায় বাহ্যিকভাবে মজবুত মনে হলেও এটি অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি অপসারণ কার্যক্রমকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। সরু গলিপথ বন্ধ করে এভাবে অবকাঠামো নির্মাণ বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
অন্যদিকে স্থানীয় বস্তি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অগ্নিকাণ্ডের পর মানবিক কারণেই গৃহহীনদের বসতি গড়তে সহায়তা করা হয়েছে। স্থানীয় এক সমাজসেবক ও প্রভাবশালী প্রতিনিধি বলেন, “আগুনে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। পুনরায় যেন অগ্নিকাণ্ড সহজে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য অনেকে নিজেদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় বা ধারদেনা করে ইটের দেয়াল তুলেছেন। তবে ঘর বাড়ানো ও গলি আটকে ফেলার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
অগ্নিদুর্ঘটনার ক্ষত মুছে নতুন পাকা দালান উঠলেও কড়াইল বস্তির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এখন বড়সড় প্রশ্নবিদ্ধ। অগ্নিকাণ্ডের পর রূপান্তরের এই অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে কড়াইলকে এক নতুন ও মারাত্মক ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, এখনই তা খতিয়ে দেখে কার্যকর পদক্ষেেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।