কোনভাবেই ঘুচছেই না শ্যামাসুন্দরীর দু:খ  :  খালকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন রংপুর সারাদেশ

আরমান হোসেন রাজু, (রংপুর)  :  রংপুর নগরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শ্যামাসুন্দরী খাল। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক খালটি একসময় নগরের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু কয়েক দশকে দখল, ভরাট, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় খালটি আজ অস্তিত্বের সংকটে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও খালটির হারানো প্রাণ এখনো ফিরিয়ে আনা যায়নি। কোনভাবেই নিরসন হচ্ছেনা শ্যামাসুন্দরীর দু:খ।

শ্যামাসুন্দরীকে খালকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার করেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি। বুধবার বিকেলে তিনি রংপুর নগরীর ডিসি মোড় এলাকায় শ্যামাসুন্দরী খাল পরিদর্শন করে তিনি এ অঙ্গীকার করেন। এসময় তার সাথে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

চলতি বছর শ্যামাসুন্দরী খাল পুনর্বাসনে প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রংপুর সিটি করপোরেশন এবং বন বিভাগকে। এর মধ্যে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে খালটির ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের মাধ্যমে পুনর্বাসন কাজ করার কথা পানি উন্নয়ন বোর্ডের।


বিজ্ঞাপন

মে মাসে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। খালটি পুন:খনন না করে শুধু কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে খালে জমে থাকা প্লাস্টিক ও বর্জ্য তুলে রাখে। এতে স্থানীয়রা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন। স্থানীয়দের প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করা হয়।


বিজ্ঞাপন

নগরীর মুন্সিপাড়[ এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক খন্দকার জানান, খালটি পুন:খনন না করে শুধু খাল থেকে প্লাস্টিক ও বর্জ্য তুলে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার অপচেষ্টা শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নগরবাসী এটা বুঝতে পেরে আন্দোলন শুরু করেন।

‘খালটি পুন:খনন ও পুনর্বাসনের নামে সরকারি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। খালটি পুন:খনন করে পুনর্বাসন কাজ করার প্রস্তুতি না থাকলে আমরা কোন কাজ করতে দিবো না,’ তিনি বলেন।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন,’ খাল থেকে প্লাস্টিক ও বর্জ্য তুলে ফেলে দিয়ে খননের প্রস্তুতি ছিলো কিন্তু স্থানীয়রা এটা বুঝতে চাননি। স্থানীয়দের প্রতিবাদে আপাতত খালের পুনর্বাসন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।’

‘দ্রুত খালটির সংস্কারকাজ পুনরায় শুরু করা হবে,’ তিনি বলেন।
তিনি বলেন, খালের সাথে লাগোয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা কাজ করবে সিটি কর্পোরেশন। এতে ব্যয় হবে সড়ে চার কোটি টাকা আর খালের দুই তীরে বৃক্ষরোপন ও শোভাবর্ধনের কাজ করবে বন বিভাগ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে দেড় কোটি টাকা।

ইতিহাস বলছে, ১৮৯০ সালের দিকে তৎকালীন রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ডিমলার জমিদার রাজা জানকীবল্লভ সেন নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে খালটি পুন:খনন করেন। তার মা চৌধুরানী শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামানুসারে খালটির নাম রাখা হয় ‘শ্যামাসুন্দরী খাল’। খালটির আগের নাম ছিল ‘ঘোষের খাল’।

এটি নগরের কেল্লাবন্দ এলাকার ঘাঘট নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে রঘুনাথ, ধাপ, কেরানীপাড়া, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর, মাহিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে আবার ঘাঘট নদীতেই মিলিত হয়েছে।

শ্যামাসুন্দরী খালের প্রশস্ততা ছিল ১০০ থেকে ১৫০ ফুট কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে বর্তমানে এর প্রশস্ততা অনেক স্থানে কমে মাত্র ২০ থেকে ৩০ ফুটে ঠেকেছে। খালের ৪০ ফুটের বেশি কিন্তু এখন ভরাট হয়ে সেটি হয়েছে ১০ থেকে ১৫ ফুট।

দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল ও বর্জ্য ফেলার কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা দোকানপাট, বসতবাড়ি, মার্কেট, ড্রেন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করায় খালের প্রস্থ অনেক জায়গায় অর্ধেকেরও কমে এসেছে। বাসাবাড়ি, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্ষা এলেই রংপুর নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা জানান, এর আগেও শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কারে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ২০১২ সালে প্রায় ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সৌন্দর্যবর্ধন, ওয়াকওয়ে, সীমানা উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য উন্নয়নকাজে কয়েক দফায় সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে। গত দুই দশকে বিভিন্ন প্রকল্পে এক শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও স্থায়ীভাবে খালটির নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

পরিবেশ কর্মী অ্যাডভোকেট পলাশকান্তি নাগ বলেন, ‘শ্যামাসুন্দরী খালকে ঘিরে আর যেন শুধু প্রকল্প আর বরাদ্দের ঘোষণা না শোনা যায়।

শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী খালকে দখল ও দূষণমুক্ত করে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি। কারণ শ্যামাসুন্দরী খাল শুধু একটি জলধারা নয়, এটি রংপুর নগরের পরিবেশ, ইতিহাস এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি।’

জেলা প্রশাসন সুত্র জানায়, খালটির সবচেয়ে বড় সংকট দখল। খালের জায়গা দখল করে অন্তত ৩০০ অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির স্থাপনাও রয়েছে খালের জমিতে।

দুই বছর আগে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১৭টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ৫-৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয়েছিল। পরে চারজন অবৈধ দখলদার আদালতের আশ্রয় নিলে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান থেমে যায়।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন,’ শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কার বর্তমানে যে প্রকল্পটি আছে এটি আগামি বছর জুনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। আমি নিজেই এ কাজের তদারকি করবো। পরবর্তিতে খালকে রক্ষায় প্রয়োজনে বড় প্রকল্প নেওয়া হবে। শ্যামাসুন্দরীকে খালকে পুনরুজ্জীবিত করা আমার অঙ্গীকার।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভাগীয় শহরগুলোর খাল, নদী ও জলাশয়ের উন্নয়নে নির্দেশনা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে খাল, নদী ও জলাশয় খনন ও পুনঃখননের কাজ চলছে। এসব জলাধারকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি শহরকে দূষণমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শ্যামাসুন্দরী খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খালের পাশে বসবাসকারী কিছু মানুষ রাতের আঁধারে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে খালের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নজরদারি করা হবে। যারা খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলবেন, তাদের জরিমানার আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, খালের উন্নয়নকাজে কোনো ব্যক্তি, দল, মত বা ধর্মের পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তিনি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

👁️ 29 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *