আসছে গরম খবর

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন রাজধানী

ধরাছোঁয়ার বাইরে রাঘববোয়ালরা

 

মহসীন আহমেদ স্বপন : অবৈধ ক্যাসিনো ও টেন্ডারবিরোধী অভিযানের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও নেপথ্যের রাঘববোয়ালরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাঘববোয়ালদের ধরতে না পারায় অভিযানের কার্যকরিতা নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্ন উঠেছে। নেপথ্যে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করতে না পারলে চলমান দুর্নীতিবিরোধি অভিযানের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, অপেক্ষা করুন, গরম খবর আসছে। তবে সেই গরম খবর কী সেটি তিনি স্পষ্ট করেননি। বুধবার সচিবালয়ে সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।
অন্যদিকে রিমান্ডে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে জি কে শামীম-খালেদ মাহমুদ টেন্ডার-ক্যাসিনোর টাকার কমিশন কারা পেতেন-সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। দু’জনের তথ্যে প্রশাসনের বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের নাম প্রকাশ পেয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ অনেককেই এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর অনেকে এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এমনকি সম্রাটের অবস্থান নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে আটক করা হয়েছে কিনা তা খুব শীঘ্রই জানা যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের চারদিন পেরিয়ে গেলেও সম্রাটের বিষয়ে ধুম্রজাল এখনও কাটেনি।
একটি সংস্থার দায়িত্বশীল দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রেফতার হয়ে যারা রিমান্ডে আছেন, তারা জিজ্ঞাসাবাদে যেসব প্রভাবশালী-প্রশাসনের ব্যক্তিদের নাম বলেছেন, তাদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা জরুরি। যতই কালক্ষেপণ হবে, ততই কঠিন হবে মূলহোতাদের আটক করা। কারণ এ সময়ের মধ্যে তারা বিদেশেও পাড়ি জমাতে পারেন।
সূত্র জানায়, বছরের পর বছর আইন-শৃংখলা বাহিনীর নাকের ডগায় ক্যাসিনো বা জুয়া চললেও এতদিনে বড় ধরনের কোনো অভিযানে নামেনি কেউ। এতে ক্যাসিনোয় জড়িত আলোচিত ব্যক্তিদের নামও ছিল অপ্রকাশ্য। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদ্য বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেফতারের পর ক্যাসিনোয় জড়িত আলোচিতদের নাম উঠে আসে। ক্যাসিনো বা জুয়া থেকে কারা, কীভাবে, কী পরিমাণ টাকা নিয়েছে সে বিষয়টিও উঠে আসে। খালেদ মাহমুদ গ্রেফতারের পর ক্যাসিনো-সংক্রান্ত ঘটনায় আলোচিতদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, জড়িতরা তাদের নজরদারিতে রয়েছেন। তার বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে বিমানবন্দর ও সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়।
র‌্যাবের কাছ থেকে পাওয়া এক তালিকা থেকে জানা যায়, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের ক্যাসিনোর মূল নিয়ন্ত্রক ইসমাইল হোসেন সম্রাট। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনোর মূল নিয়ন্ত্রক স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার।
আইন-শৃংখলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, খালেদ মাহমুদ ও জি কে শামীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবলীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন। এছাড়া ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোবাশ্বের চৌধুরী, কাউন্সিলর কাজী আনিসুর রহমান, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু, তার ভাই রুপন ভূঁইয়া ও আবদুর রশীদের নাম এলেও তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্রাটের অন্যতম সহযোগী যুবলীগ নেতা আরমানুল হক আরমান, বাদল এবং জুয়াড়ি খোরশেদ আলমও গা-ঢাকা দিয়েছেন। এছাড়া মতিঝিলের দিলকুশা ক্লাবের আবদুল মান্নান, আজাদ বয়েজ ক্লাবের একেএম নাছির উদ্দিন ও হাসান উদ্দিন জামানের ‘ক্যাসিনোর ব্যবসা’র সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলেও এখনও তাদের গ্রেফতার করা যায়নি।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, আমরা তাদেরকে (জিকে শামীম-খালেদ মাহমুদ) নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। অনেক বিষয় নিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মদদদাতা ও সহযোগি হিসেবে যাদের নাম প্রকাশ করেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। এছাড়া যে সব তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে সেগুলো আমরা আমলে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করছি।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, জুয়া ক্যাসিনো টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। নিঃসন্দেহে আশা করব এই অভিযান চলমান থাকবে এবং রাঘববোয়ালরা ধরা পড়বে। সেটা না হলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা এবং অভিযানের উৎস প্রশ্নবিদ্ধ হবে
বিশ্লেষকদের আরও অভিমত জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, পুলিশ ও প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত থাকলেও তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। অপরাধের গভীরে গিয়ে এর মূল উৎপাটন করতে হবে। যতই কালক্ষেপণ হবে, ততই কঠিন হবে মূলহোতাদের আটক করা। কারণ এ সময়ের মধ্যে তারা বিদেশেও পাড়ি জমাতে পারেন। শুধু তাই নয়, তাদের হাতে থাকা অবৈধ টাকা খরচ করে নিজেদের আড়াল করতে পারে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলছে সারাদেশে টেন্ডার ও চাঁদাবাজি এবং ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। গত ১৪দিনে মোট ৩৪টি অভিযান (র‌্যাব ১৮ ও পুলিশ ১৪) পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর যুবলীগের দুই নেতা- খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীম ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজসহ ১৫জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এসব অভিযানে নগদ ১৭ কোটি টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২০১ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়া হয়েছে।
গরম খবর আসছে : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, অপেক্ষা করুন, গরম খবর আসছে। তবে সেই গরম খবর কী সেটি তিনি স্পষ্ট করেননি। বুধবার সচিবালয়ে সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।
কী ধরনের খবর জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, কী ধরনের খবর সেটা বলে দিলে তো হয় না। সময় আসলে জানতে পারবেন। এরপরও সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারপ্রাইজ থাকল।
চলমান অভিযানের মধ্যে যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে নিয়ে একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি কী গ্রেফতার হয়েছেন, নাকি বিদেশে চলে গেছেন? এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি তো বলেছি ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন; দেখতে পাবেন।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ক্ষমতায়। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে গেছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চাঁদাবাজি এখনও চলছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, আমরা যে তৃণমূলে সম্মেলন করছি, সংগঠনকে নতুন করে ঢেলে সাজাচ্ছি। এখানেও একটা ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। যারা অপকর্মের সাথে জড়িত, যাদের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ আছে, সেসব লোককে আমরা দলের নেতৃত্ব পদে বসাব না। এটাও আমাদের তৃণমূলে সম্মেলন করার একটা উদ্দেশ।
ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যারা চাঁদাবাজি করছে তাদের কোনো তালিকা আছে কি-না? জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমার কাছে কোনো তালিকা নেই, তবে নজরদারি আছে।
এখনও তথাকথিত লাইনম্যানরা চাঁদা উঠাচ্ছে- একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনি একটা ধরে নিয়ে আসেন, আজকেই জেলে দেব। আমার কানে কানে বলুন।