গরিব ছাত্রীদের চাঁদার টাকা লুট : অডিটে কোটি টাকার অনিয়ম—বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশনে ‘অদৃশ্য আয়না ঘর’ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  একসময় শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি এখন অভিযোগের পাহাড়ে চেপে বসা এক ‘নিপীড়ন ও লুটপাটের কাঠামো’তে রূপ নিয়েছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগম—যিনি সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। গরিব ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের চাঁদা, সরকারি অনুদান ও উন্নয়ন তহবিল—সব মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অডিট রিপোর্টেও উঠে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের চিত্র।

অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও দলীয়করণ : বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশন একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান হলেও অভিযোগ রয়েছে—জাতীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজী জেবুন্নেছা এখানে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করেন। নিজস্ব অনুসারীদের দিয়ে গড়ে তোলেন ‘লেজুরভিত্তিক গ্রুপ’, যাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় নিয়োগ, ক্রয়-বিক্রয় ও আর্থিক কার্যক্রম। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই বলয়ের বাইরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছিলেন চরম মানসিক নিপীড়ন ও হুমকির মধ্যে। প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয় এক ধরনের ‘আমলা আয়না ঘর’-এ, যেখানে ভিন্নমত দমন ছিল নিয়মিত চর্চা।


বিজ্ঞাপন

কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ : শিক্ষা অডিট রিপোর্ট (২০২১-২২, ২০২৩-২৪) বিশ্লেষণে দেখা গেছে—
বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের পর অব্যয়িত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজস্ব অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে।
সরকারি ক্ষতি: ২ কোটি ৫৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৩৯ টাকা। ক্রয় কমিটির মাধ্যমে নিজের পছন্দের লোক দিয়ে কেনাকাটা করিয়ে সরবরাহকারী বিল পরিশোধে ভ্যাট-ট্যাক্স কর্তন করা হয়নি। সরকারি ক্ষতি: ৪ লাখ ৬১ হাজার ১৯৪ টাকা।


বিজ্ঞাপন

নিয়মবহির্ভূত নিয়োগে— কর্মী সহকারী মালেকা পারভীন ও ট্রেনার সুফিয়া বেগমকে অর্গানোগ্রাম বহির্ভূত ও ঘটনাত্তোর নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি ক্ষতি: ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৮ টাকা। কোনো বাজেট প্রাক্কলন বা এপিপি ছাড়াই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্রয় ও সংস্কারে ব্যয় করা হয়েছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা অডিটে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত।

এসএমএসেই লুটপাট !  জাতীয় দিবস ও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাতে যেখানে প্রতিটি এসএমএসের প্রকৃত খরচ ছিল ৪৫–৬৫ পয়সা, সেখানে বিল দেখানো হয়েছে ১৫ টাকা করে ! ক্ষতি: ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

অডিট কর্মকর্তারা বলছেন —এসএমএস বিল দেখলেই বোঝা যায় কীভাবে কাগজে-কলমে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে গরিব ছাত্রীদের অর্থ লুট করা হয়েছে।

বিদেশ ভ্রমণে চাঁদার অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, মধ্যবিত্ত ও হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত তহবিল থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করে ১০ সদস্যের বহর নিয়ে সাইপ্রাস ও মিশর সফর করেন জাতীয় কমিশনার। অথচ প্রয়োজন ছিল সর্বোচ্চ ২-৩ জন প্রতিনিধি। এই সফর নিয়েও অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে।

স্বজনপ্রীতির ‘বিউটি পার্লার’ কেলেঙ্কারি : কাজী জেবুন্নেছার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফেরদৌসী আক্তার ডলিকে প্রধান কার্যালয়ে বিউটি পার্লার বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৩.৭৩ টাকা প্রতি বর্গফুট ভাড়ায়। অথচ একই ভবনে অন্য সরকারি দপ্তরকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা হারে। বার্ষিক লোকসান: ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১১২ টাকা।

প্রশ্নের মুখে কর্মকর্তারা, এড়িয়ে যাচ্ছেন জবাব : এ বিষয়ে জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদকের পরিচয় শুনেই তিনি ফোন কেটে দেন। ক্ষুদে বার্তায় প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

জাতীয় ডিপুটি কমিশনার ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাবিনা ফেরদৌসী বলেন, “আমরা অডিট অফিসে জবাব দিয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যমূলক বদনাম ছড়াচ্ছে।” শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন-এর দপ্তর জানায়, “ম্যাডাম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না। লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে।”

প্রশ্ন উঠছে— গরিব শিক্ষার্থীদের অর্থ কীভাবে লুট হলো? অডিটে কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন ব্যবস্থা নেই? একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কীভাবে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক লুটের কেন্দ্রে পরিণত হলো?

বিশেষজ্ঞদের মত :  সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, “অডিট আপত্তি প্রমাণ করে এখানে শুধু প্রশাসনিক নয়, সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। দ্রুত স্বাধীন তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

শেষ কথা : যে প্রতিষ্ঠানটি একদিন কিশোরীদের নেতৃত্ব ও মানবিকতার শিক্ষা দিত, আজ সেই গার্ল গাইডস এসোসিয়েশনই দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত। গরিব শিক্ষার্থীদের ঘামঝরা চাঁদার টাকায় যদি বিদেশ সফর, ভুয়া বিল ও স্বজনপ্রীতি চলে—তবে জবাবদিহি কার কাছে?  দেশবাসী এখন স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করছে।

👁️ 22 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *