
রিয়াদ আহমেদ : কুরুম আলী ও তাঁর ছোট ভাই মোজাম্মেল। নাডা রুবেল, ইয়াছিন, সোহেল, সবুজ খাঁন ও শহিদুল ইসলাম ওরফে ফর্মা শহীদ। এঁরা সবাই রাজধানী বনানীর ভিন্ন ভিন্ন বস্তির অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। তাঁদের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে আতঙ্কিত এলাকাবাসী।

বেলতলা বস্তি এলাকার দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ কুরুম আলী। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পর কুরুম বেলতলা অংশের চাঁদাবাজির দখল নেয়। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ চুরি, বাজার দখল ছাড়াও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ময়লার টেন্ডার বাগিয়ে নেয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কুরুম স্থানীয় প্রভাবশালী সব নেতাদের সঙ্গে চাঁদার ভাগ বন্টন করেই বস্তিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের পর থেকে কুরুম স্থানীয় সব নেতাদের চাঁদার ভাগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এখন চাঁদার ভাগ না পাওয়া সেই নেতারাই এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুরুম এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হাতে গোনা দু’একজন নেতা ছাড়া শুধুমাত্র বনানী থানার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বেলতলা বস্তির চাঁদাবাজি পরিচালনা করছেন। কুরুম নাকি এখন স্থানীয় কোনো নেতাদের গোনায় ধরে না। হটাৎ তাঁর এতো ক্ষমতার উৎস কী? খোঁজ করতেই বেরিয়ে আসে ভয়ংকর তথ্য। জানা গেছে, তাঁর হেফাজতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র। যেসব অস্ত্রের ভয়েই প্রতিপক্ষরা কুপোকাত! আধিপত্য বিস্তার করতে প্রায়ই তাঁর বাহিনী অস্ত্রের মহড়া দেয়। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই অস্ত্রের মুখে হুমকি ধামকি দিয়ে দমিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুরুমে ছোট ভাই অবৈধ অস্ত্রের ক্ষমতাবলে প্রকাশ্যেই হুংকার দিয়ে বেড়ায় কেউ আমাদের কিছু ছিঁড়তে পারবা না।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, প্রতিদিন গভীর রাতে কুরুমের আস্তানায় বনানী থানা পুলিশের শীর্ষ কর্তারা গোপন বৈঠক করেন। গোপন বৈঠকে গোপন আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকে। যে কারণে কুরুম বেপরোয়া।
বনানী থানা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আল মামুন খাঁন তাঁর নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে কুরুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী অ্যামিনুল হকসহ দলটির নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান -এর প্রতি বিষয়টি অবগত করার আহ্বান জানান।
বেলতলা বস্তিতে গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসা করে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ইয়াছিন, নাডা রুবেল ও তাঁর ভাই সোহোরাল। কিছু হলেই তাঁরা পিস্তল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পুলিশের কথিত সোর্সও তাঁরা যে কারনে এখনও অধরা! সম্প্রতি তাঁরা একজনের বাড়ি দখল করে সেখানে মাদক ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ এসেছে। ওই ভুক্তভোগীর নাম জাহিদ খাঁন। তিনি পেশায় গাড়ি চালক। জাহিদ খাঁন বলেন, ‘বস্তিতে আমার কেনা বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না মোটা অংকের চাঁদার দাবিতে। আমি সেখানে গেলে মাদক ব্যবসায়ী নাডা রুবেল কালো রঙের একটি পিস্তল উঁচিয়ে ভয় দেখায়। এবং মাদক ব্যবসায়ী ইয়াছিন ও সোহেল মারধর করে টাকা পয়সা মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে আমাকে বের করে দেয়। আমি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।
অপরপাশে গোডাউন বস্তিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী শহিদুল ইসলাম ওরফে ফর্মা শহীদ। পুলিশের কথিত সোর্স। মাদক ব্যবসার মহাজন সে। পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় আগে থেকেই বেপরোয়া। বর্তমানে শহীদ গোডাউন বস্তির শীর্ষ চাঁদাবাজ। অবৈধ অস্ত্রের মুখে নিরীহ মানুষের ঘর দখল করছে। রাতের গভীরে ঝিল ভরাট করে নতুন নতুন ঘর তুলছে। গ্যারেজ বানাচ্ছে। তাঁর পেছনে কয়েকজন বিএনপি নেতার ছায়া রয়েছে। তাঁর রয়েছে চোর ও হিজড়ার বাহিনী। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী স্থানীয় নেতা সব মহল ম্যানেজ করে শহীদ গড়ে তুলেছে ভয়ংকর অপরাধ জগত ও মাদক সিন্ডিকেট।
বস্তির একজন বাসিন্দা ফারুক মিয়া তাঁর মোবাইলে গোপনে একটি ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে শেয়ার করেন। তাতে দেখা যায়, শহীদ মাতাল অবস্থায় অবৈধ পিস্তল হাতে উঁচিয়ে এক ব্যক্তিকে গালাগালি করছেন। লাথি দিচ্ছেন। জানা গেছে, ওই ব্যাক্তি বস্তির একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী। চাঁদা না দেওয়ায় শহীদ তাকে ধরে এনেছিল। আরও জানা যায়, শহীদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে এটা নাকি বনানী থানায় ওপেন সিক্রেট। এর আগে শহীদের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর করা অভিযোগপত্র গুলশান বিভাগ পুলিশের উপ-কমিশনার বরাবর জমা দিয়েছিল বস্তিবাসী।
বেলতলা বস্তির আরেক অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সবুজ খাঁন। তিনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন। তাঁর রয়েছে একটি কিশোর গ্যাং। যাঁরা প্রায়ই এলাকার পরিবেশ অস্থির করে তুলে। সবুজ বলে বেড়ায়, ‘অস্ত্র লাগলে অস্ত্র দিমু। পোলাপান লাগলে পোলাপান।’ সবুজ খাঁনকে দলে টানার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বনানী থানা বিএনপির একজন সদস্য আবু জাফর দেওয়ান।
বনানী থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, মিজানুর রহমান মিজান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসনে কোনো সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ থাকবে না। শীঘ্রই অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়া হব।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বনানী থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এসব অবৈধ অস্ত্রধারীদের তথ্য নেই। তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
