প্রায় ৫ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম অচল, সংসদে হেডফোন কেলেঙ্কারি : গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতিতে অধিবেশন বন্ধ, তবু ‘প্রশিক্ষণ’ নামে বিদেশ সফরের তোড়জোড় !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আলোচিত ও সমালোচিত সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমকান্ডে অভিযুক্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ঘটলো বিব্রতকর এক ঘটনা। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা নতুন সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ায় সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে থমকে যায়। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের নিম্নমান নিয়েও উঠেছে তীব্র সমালোচনা। এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় সংসদের মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের দায় কার?

হেডফোনেই শুরু বিতর্ক :  বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম  (ব্যারিস্টার আরমান)  সংসদে সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়ে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।


বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি কালো রঙের হেডফোনের ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন—“সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই খারাপ যে ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা ধরেছে। সাউন্ড কোয়ালিটিও অত্যন্ত নিম্নমানের। পুরোনো ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে পরিষ্কার অডিও দিত।” তার এই পোস্ট দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।


বিজ্ঞাপন
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম  (ব্যারিস্টার আরমান)।

হঠাৎ অচল পুরো সাউন্ড সিস্টেম  :  ঘটনার সূত্রপাত হয় অধিবেশন চলাকালেই। নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য শুরু করতে গেলে সংসদের মূল সাউন্ড সিস্টেমে হঠাৎ করেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। মাইকে কথা বললেও তা ঠিকভাবে শোনা যাচ্ছিল না।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকারকে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে বক্তব্য দিতে হয়। এ সময় তিনি অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। পরে বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়কে অনেকেই “রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার লজ্জাজনক ব্যর্থতা” হিসেবে দেখছেন।

প্রায় ৫ কোটি টাকার সিস্টেম কেন অচল ?  সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন এই সাউন্ড সিস্টেম কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সংসদের মতো উচ্চ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ১০–১২ দিন নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পরই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। সাউন্ড সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দুলাল। ঘটনার পর তার ভূমিকা নিয়েও খোঁজখবর শুরু হয়েছে।

পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি ?  সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলী।

তারা হলেন— অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।

অভিযোগ উঠেছে, অযোগ্যতা, তদারকির ঘাটতি এবং অবহেলার কারণেই সংসদের নতুন সাউন্ড সিস্টেম কার্যত প্রথম দিনেই ভেঙে পড়েছে।

আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—এই একই আশ্রাফুল হক ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকাকালেও অধিবেশন চলাকালে ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে— বারবার একই ধরনের বিপর্যয়ের পরও কেন এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

যুক্তরাষ্ট্রে  এসি চালানো শিখতে যাওয়া সেই তিন কর্মকর্তা যারা জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমকান্ডে অভিযুক্ত।

ব্যর্থতার মধ্যেও বিদেশ সফর  !  এদিকে সংসদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে আরেক ঘটনায়। সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন।

একই সফরে অংশ নিচ্ছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলমসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। এই প্রশিক্ষণের বিষয় HVAC সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ, যা মূলত মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের জন্য প্রযোজ্য।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে— প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা
অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা প্রকৌশলী, প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন কর্মকর্তারা। এই সফরের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। ফলে অনেকেই এটিকে “প্রশিক্ষণের আড়ালে আমলাতান্ত্রিক প্রমোদ ভ্রমণ” বলে মন্তব্য করছেন।

কোম্পানির টাকায় বিদেশ—স্বার্থের দ্বন্দ্ব  : সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই সফরের ব্যয় বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যারা HVAC রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলম বলেছেন— “ওদের টাকায় বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।” কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন দুর্নীতি বিরোধী বিশ্লেষকরা।

টিআইবি বলছে—এটি দুর্নীতির সংস্কৃতি   :  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কোম্পানির টাকায় বিদেশ যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যা। এটি স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তার মতে, অনলাইনের যুগে প্রযুক্তিগত তথ্য জানতে বিদেশ সফর অপরিহার্য নয়। বরং এসব সফর অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত।

প্রশ্ন এখন একটাই : জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যখন প্রায় ৫ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম ভেঙে পড়ে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে— কারা এই ক্রয় প্রক্রিয়া তদারকি করেছে ? কেন পরীক্ষা–নিরীক্ষা ছাড়াই সিস্টেম চালু করা হলো ?

দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে কি ? নাকি আবারও সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে— আর অযোগ্যতা ও গাফিলতির পুরস্কার হিসেবে বিদেশ সফরের টিকিটই হবে শেষ পরিণতি?

👁️ 122 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *