আউটসোর্সিংয়ের আড়ালে ৩০ কোটি টাকার ‘গোপন খেলা’ : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক শাহজামান তুহিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক শাহজামান তুহিন।


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে সারা দেশের প্রতিটি উপজেলায় একজন করে এআই (কৃত্রিম প্রজনন) টেকনিশিয়ান নিয়োগের নামে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্যের পরিকল্পনা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিনের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পছন্দের ঠিকাদার ঠিক করে রেখে ‘মাঠ তৈরি’ করার কাজ শুরু করেছেন পরিচালক নিজেই, যা সরকারি ক্রয় ও নিয়োগ নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


বিজ্ঞাপন

৪৯৫ পদের অনুমোদন, শুরুতেই বিতর্ক  :  জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে প্রতিটি উপজেলায় ১ জন করে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ৪৯৫টি পদের অনুমোদন দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন

এই অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিন কৃত্রিম প্রজনন সেবা দেওয়ার জন্য জনবল সরবরাহকারী ঠিকাদার নিয়োগে পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করেছেন।

কিন্তু দরপত্র দলিলে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যাতে করে ৩–৪টির বেশি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান বাস্তবে অংশ নিতে না পারে।

অভিযোগ রয়েছে—এই শর্তগুলো পরিকল্পিতভাবে বসানো হয়েছে, যাতে আগেই ঠিক করা একটি প্রতিষ্ঠান সহজেই কাজটি পেয়ে যায়।

আগে থেকেই ঠিক ‘পছন্দের ঠিকাদার  ’!  একাধিক সূত্রের দাবি, পরিচালক শাহজামান খান তুহিন বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগেই গোপন সমঝোতা করেছেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী কাজটি ওই প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হবে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—যে কাজটি করার কথা ঠিকাদারের, সেটি নিজেই করে দিচ্ছেন পরিচালক।

সূত্র জানায়, ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে দেশের প্রতিটি উপজেলায় চিঠি পাঠিয়ে ৩ জন করে অভিজ্ঞ এআই টেকনিশিয়ানের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি মূলত প্রার্থীদের কাছ থেকে আগাম দরদাম ঠিক করার একটি কৌশল।

ঠিকাদারের কাজ করছেন পরিচালক !   নিয়ম অনুযায়ী, আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন গ্রহণ করবে, প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করবে এবং নির্বাচিতদের বায়োডাটা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেবে।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পরিচালক শাহজামান খান তুহিন নিজেই সেই পুরো প্রক্রিয়া আগেভাগে সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, “যে কাজ ঠিকাদারের করার কথা, সেটি হাজার হাজার টাকা খরচ করে পরিচালক নিজেই করছেন। এর মানে স্পষ্ট—সব কিছু আগে থেকেই সাজানো।”

হাজারো প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান থাকতেও ‘গোপন তালিকা’ :
সূত্রমতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে ৫ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত এআই টেকনিশিয়ান রয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে ঠিকাদার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে এসব প্রশিক্ষিত কর্মীরাই আবেদন করবেন। এরপর যাচাই-বাছাই করে যোগ্যদের নির্বাচন করার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে তালিকা তৈরি করছেন পরিচালক।

মহাপরিচালকের ক্ষমতা ‘ছিনিয়ে’ নিচ্ছেন ? প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, রাজস্ব খাতে সৃষ্ট আউটসোর্সিং পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্ব মহাপরিচালকের দপ্তরের। অতীতেও এই নিয়মেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

কিন্তু এবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেই পুরো প্রক্রিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে পরিচালক শাহজামান খান তুহিনের বিরুদ্ধে।

“৩০ কোটি টাকার খেলা’  :  অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, পুরো আউটসোর্সিং প্রকল্পকে ঘিরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার একটি বড় বাণিজ্যের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সব কিছু আগে থেকেই সেট করা। ঠিকাদারও ঠিক, প্রার্থীও ঠিক। এখন শুধু কাগজে-কলমে নাটকটা শেষ করা বাকি।”

তদন্ত ও বদলির দাবি : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিচালক শাহজামান খান তুহিনকে অবিলম্বে অন্যত্র বদলি এবং তার বিরুদ্ধে সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেছেন।

তাদের দাবি— আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া মহাপরিচালকের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা হোক। এ বিষয়ে তারা প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নীরব প্রশাসন, প্রশ্নের পাহাড়  :  প্রশ্ন উঠেছে— একজন প্রকল্প পরিচালক কীভাবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন ? দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হলো কেন, যাতে প্রতিযোগিতা কমে যায় ? এবং ঠিকাদার নিয়োগের আগেই প্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করার পেছনে উদ্দেশ্য কী ? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে একটি বিষয়ই এখন জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে—“এটি কি নিয়োগ, নাকি ৩০ কোটি টাকার একটি সাজানো খেলা ?”

👁️ 45 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *