
বিশেষ প্রতিবেদক : দেশে দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠলেই যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার আলোচনায় আসে, তার অন্যতম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে—ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হতো না। এই দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহ—যার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ গঠন এবং রাজনৈতিক ফান্ডে অর্থ যোগানের বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে।

ঢাকায় বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স, শ্যামলীতে মার্বেল বাড়ি, গাজীপুরে অট্টালিকা : অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাবর রোডে শেলটেক চন্দ্রমল্লিকায় বি-ব্লকের ১৩/এ/১ নম্বরে শহীদুল্লাহর রয়েছে আলিশান ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট।
শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে ১২-ঠ-৭ হোল্ডিংয়ে রয়েছে মার্বেল পাথরে মোড়ানো বহুতল বিলাসবহুল ভবন। এছাড়া গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনায় রয়েছে আরও দুটি নজরকাড়া বাড়ি। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার কাচারিকান্দিতেও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ রয়েছে। দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পরিবারের বিলাস ভ্রমণ ছিল নিয়মিত—যা সংশ্লিষ্ট মহলে ‘প্রকাশ্য গোপনীয়তা’ হিসেবেই পরিচিত।

সিএনজি রিপ্লেস ধান্ধার হোতা : বিআরটিএর আলোচিত সিএনজি ‘রিপ্লেস’ প্রকল্পে মোটা অঙ্কের ঘুষ-বাণিজ্যের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন শহীদুল্লাহ।

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে: ১৩ হাজার সিএনজি প্রতিস্থাপনে প্রতি ইউনিটে ২ লাখ টাকা, রেজিস্ট্রেশনে ৫০ হাজার টাকা, মোট আদায়: ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এছাড়া— ভারতীয় ৪ আসনের ২ হাজার ম্যাগজিমা অটোকে বেআইনিভাবে ৭ আসনের টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন, গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা করে ৪০ কোটি টাকা, ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি থেকে গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা, মোট ৬০ কোটি টাকাসহ সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালেই শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ জমা পড়েছে।
ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে অর্থ যোগান : বিআরটিএ সূত্র জানায়, সংস্থাটি থেকে ঘুষ ও চাঁদা তুলে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রাখতেন শহীদুল্লাহ। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
‘লম্বা হাত’-এর রক্ষাকবচে অদৃশ্য সাম্রাজ্য : বিআরটিএ অঙ্গনে শহীদুল্লাহ পরিচিত ছিলেন ‘জমিদার’ হিসেবে। তার নিয়ন্ত্রণে শতাধিক গাড়ির শোরুম ম্যানেজার, দালাল সিন্ডিকেট এবং নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল।
অভিযোগ রয়েছে—পরিচালক প্রশাসনের ‘অদৃশ্য লম্বা হাত’-এর রক্ষাকবচে তিনি সব সার্কেলের ঘুষবাজদের সক্রিয় রাখতেন এবং বিনিময়ে নিয়মিত মোটা উৎকোচ পেতেন।
ছাত্র আন্দোলন ভিন্নখাতে নেওয়ার অভিযোগ : জুলাইয়ের আলোচিত ছাত্র আন্দোলন দমন ও ভিন্নখাতে নেওয়ার ষড়যন্ত্রেও শহীদুল্লাহ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পাল এবং ওবায়দুল কাদেরের পিএসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি দাবি প্রচার করেন—আন্দোলনের সময় তিনি দেশে ছিলেন না—যাকে সংশ্লিষ্ট মহল ব্যঙ্গ করে বলছে, “ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না!”
ঢাকায় বদলি, কিন্তু দুর্নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত : সমালোচনা বাড়লে ২০২২ সালে শহীদুল্লাহকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৩ জুন অফিস আদেশে তাকে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং উইংয়ের পরিচালক পদে বদলি করা হয়। কিন্তু অভিযোগ—সেখানে গিয়েও তার অদৃশ্য সিন্ডিকেট বহাল রয়েছে।
প্রশাসনের নীরবতা, বহাল তবিয়তে দুর্নীতিবাজ আমলা : স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরও শহীদুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। নীতির ফেরিওয়ালার মুখোশে কয়েক বছরে গড়ে তুলেছেন নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের পাহাড়।
যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ : অভিযোগের বিষয়ে জানতে শহীদুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন এখন একটাই : ৩৮৭ কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগের পরও কি শহীদুল্লাহ সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে ? নাকি এবার সত্যিই ভাঙবে বিআরটিএর অদৃশ্য দুর্নীতির দুর্গ?
