
নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে বহুল আলোচিত বদলির পরও থামেনি অনিয়ম-দুর্নীতির ধারা। বরং নতুন তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, গত এক বছরে এই ইউনিটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি সংঘবদ্ধ ‘ফার্নিচার সিন্ডিকেট’, যার নেপথ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, সরকারি ফার্নিচার সরবরাহ কাজকে কেন্দ্র করে সাধারণ লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের কোণঠাসা করে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশেষ কৌশলভিত্তিক দরপত্র ব্যবস্থাপনা। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে বছরের পর বছর কাজ করা অভিজ্ঞ ঠিকাদাররা কার্যত বঞ্চিত হয়েছেন।
দরপত্র বিক্রির ‘গোপন রেটকোড’ কৌশল : অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন প্রকল্পের এস্টিমেট প্রস্তুতের পর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে অগ্রিম শতাংশ হারে অর্থ নিয়ে গোপনে রেটকোড সরবরাহ করতেন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ফার্নিচার কোম্পানিকেও সেই রেট জানিয়ে দেওয়া হতো। ফলে দরপত্রে প্রতিযোগিতা কাগজে থাকলেও বাস্তবে কাজ পেত নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানই।

যেসব ঠিকাদার কাজ পেতেন না, তাদেরকে “পরের লটে কাজ দেওয়া হবে”—এই আশ্বাসে মাসের পর মাস ঘুরিয়ে রাখা হতো। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঠিকাদারদের ব্যবসা কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়ে।

কাজ পেলেও অর্ধেক সাব-কন্ট্রাক্ট বাধ্যতামূলক : আরও অভিযোগ রয়েছে—কোনো সাধারণ ঠিকাদার কাজ পেয়ে গেলে তাকেও বাধ্য করা হতো নির্দিষ্ট একটি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল নিতে বা কাজের বড় অংশ সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে। মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হতো—নির্দেশ না মানলে চুক্তি বাতিল বা বিল আটকে দেওয়া হবে।
এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান গত দুই অর্থবছরে শত কোটি টাকার সরকারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে নথিপত্র বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রশ্নবিদ্ধ বরাদ্দ : অনুসন্ধান বলছে, চলমান ও সমাপ্ত একাধিক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ফার্নিচার সরবরাহের কাজ ভবনের নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই বরাদ্দ ও বিল প্রদানের নজির পাওয়া গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই বিল ছাড়ের অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্বাক্ষর না দিলেও ঊর্ধ্বতন নির্দেশে বিল ছাড় হতো, যা সরকারি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নারী সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ : ডিভিশনের একাধিক সূত্র জানায়, অফিস পরিবেশ নিয়ে নারী সহকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি ও নিরাপত্তা শঙ্কা ছিল। একাধিক নারী প্রকৌশলী দায়িত্বকাল অসম্পূর্ণ রেখে বদলি নিয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
বদলির পরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা : গত ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীতে বদলির আদেশ হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ঢাকায় পুনরায় পোস্টিং পেতে উচ্চপর্যায়ে দৌড়ঝাপ চালান বলে জানা গেছে। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
তদন্তের ইঙ্গিত : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট ডিভিশনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রস্তুতি চলছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত গড়াতে পারে।
যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ : অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
উপসংহার : রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থাই সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট নির্ভর কাজ বণ্টনের সংস্কৃতি চলতে থাকলে একদিকে সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে প্রকৃত যোগ্য ঠিকাদাররা পেশা হারাবেন। এখন দেখার বিষয়—চলমান তদন্তে আদৌ দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।
