
নিজস্ব প্রতিবেদক : “ভোটে জয়ী হলেও আমরা তা ছেড়ে দেব”— জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মো. কাদেরের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোড়ন তুলেছে। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই নেতার বক্তব্যকে অনেকেই দেখছেন জনগণের ভোটাধিকারকে অবজ্ঞা করার প্রকাশ্য ঘোষণা হিসেবে।

কিন্তু এই বক্তব্য সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়—মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের শহীদ হওয়া এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গানবোট পদ্মা ও পলাশ ধ্বংসের ঘটনা। একটি ঘটনা যেখানে প্রশ্ন উঠেছে—শত্রু নয়, মিত্রের হাতেই কি আঘাত এসেছিল?
মুক্তিযুদ্ধে নৌবাহিনীর সূচনা ও বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন : ১৯৭১ সালে মেজর শফিউল্লাহর নেতৃত্বাধীন ২ নম্বর সেক্টরে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেন রুহুল আমিন। তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের অন্যতম সংগঠক। পরবর্তীতে বিভিন্ন সেক্টরের নৌযোদ্ধাদের একত্র করে গঠিত হয় ১০ নম্বর নৌ সেক্টর।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম দুটি গানবোট—পদ্মা ও পলাশ—১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ মংলা বন্দরের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেয়। এখান থেকেই শুরু হয় এক রহস্যময় ও বিতর্কিত অধ্যায়।

যে হামলার উৎস আজও প্রশ্নবিদ্ধ : প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন ডিক্লাসিফায়েড আন্তর্জাতিক নথি অনুযায়ী, মংলা উপকূলে অবস্থানকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান পদ্মা ও পলাশকে অনুসরণ করতে থাকে। পরিচয় জানানোর পরও হঠাৎ করেই আক্রমণ শুরু হয়।

ফলে পদ্মা ও পলাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নৌযোদ্ধাদের অনেকে হতাহত হন। সংকটময় মুহূর্তে রুহুল আমিন শেষ পর্যন্ত জাহাজ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রচণ্ড আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শহীদ হন। পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণ তার মরদেহ দাফন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ পরে তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্ন : ঘটনাস্থলের কাছেই একটি ভারতীয় গানবোট ‘পানভেল’ অবস্থান করছিল—কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেটি অক্ষত থাকে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে— হামলার লক্ষ্য কি ভুলবশত ছিল ? নাকি এটি ছিল কৌশলগত ‘বন্ধুত্বপূর্ণ আগ্রাসন’? কেন এই ঘটনা বহু বছর রাষ্ট্রীয় আলোচনায় অনুপস্থিত থেকেছে? এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
ডিক্লাসিফায়েড নথিতে কী মিলেছে ? যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপীয় আর্কাইভের ডিক্লাসিফায়েড কূটনৈতিক নথি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়—১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগর ও খুলনা-মংলা অঞ্চলে ভারতীয় নৌ ও বিমান চলাচল ছিল অত্যন্ত সক্রিয় এবং সমন্বয়হীনতার কারণে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ঘটার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ আছে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইতিহাসে এই অধ্যায় কখনো পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের মুখ দেখেনি।
গোলাম মো. কাদেরের বক্তব্য ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা : এমন এক সময়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মো. কাদেরের বক্তব্য—“ভোট জিতলেও আমরা তা ছেড়ে দেব”— নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—জনগণের ভোটের মূল্য কতটুকু ? স্বাধীনতার চেতনায় গড়া রাষ্ট্রে আত্মসমর্পণের রাজনীতি কার স্বার্থে ? ইতিহাসের অসমাপ্ত সত্যগুলো কি আবার আড়ালেই থেকে যাবে?
শেষ কথা : বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গর্বিত অধ্যায়। কিন্তু তার শহীদ হওয়ার প্রেক্ষাপট ঘিরে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো আজও জাতির সামনে উন্মুক্ত। আর ঠিক সেই সময়েই যখন একটি রাজনৈতিক দল ভোট ত্যাগের ঘোষণা দেয়—তখন ইতিহাস যেন স্মরণ করিয়ে দেয় : স্বাধীনতা শুধু অর্জনের নয়—তার সত্য রক্ষার লড়াইও অব্যাহত রাখতে হয়।
