
নিজস্ব প্রতিনিধি (ফরিদপুর) : দেশজুড়ে যখন আওয়ামী শাসনামলের দুর্নীতি ও লুটপাটের একের পর এক চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই সামনে এলো ফরিদপুরের আলোচিত আওয়ামী মৎস্যজীবীলীগ নেতা আব্দুস সোবহানকে ঘিরে এক ভয়াবহ প্রতারণা চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ—পিলার ও কয়েন নামের কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু এবং ভুয়া দলিল দেখিয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগীদের ভাষায়—এটি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ, যার নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নীরবতা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের ছত্রছায়া কাজ করেছে।
লোভ দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করার কৌশল : ভুক্তভোগীরা জানান, আব্দুস সোবহান নিজেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। দাবি করতেন—তার কাছে থাকা ‘পিলার’ ও ‘কয়েন’ বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করলে বিপুল লাভ হবে।
ভুয়া দলিল, কথিত অনুমোদনপত্র ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গল্প শুনিয়ে একে একে ব্যবসায়ীদের আস্থার জাল বিস্তার করেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই ধাতব বস্তুগুলোর কোনো প্রকৃত বাজারমূল্য নেই। সবই ছিল সাজানো নাটক।

কারা পড়েছেন ফাঁদে : ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন,
রাজিয়া সুলতানা বেবী, এমএ কাদের (কিচেন গ্রুপের মালিক), এনামুল হক চৌধুরী খসরু (এনার্জিপ্যাক), মোঃ মঈন বিশ্বাস, আবুল খায়ের লিটু (বেঙ্গল গ্রুপ), মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী), ফেনী, অভিযোগ অনুযায়ী, কখনো এককালীন, কখনো ধাপে ধাপে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। শুরুতে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও অর্থ নেওয়ার পর একপর্যায়ে সোবহান আত্মগোপনের কৌশল নেন।


প্রতারণার আঘাতে প্রাণহানির অভিযোগ : সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিযোগ এসেছে রাজিয়া সুলতানা বেবীর পরিবারের পক্ষ থেকে। তারা জানান, প্রতারণায় সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। মানসিক চাপে তার বাবা ইউনুছ তালুকদারের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের দাবি—এই আর্থিক ধাক্কাই পারিবারিক বিপর্যয়ের মূল কারণ।
শীর্ষ শিল্পপতিও রক্ষা পাননি : এমএ কাদের বলেন, প্রতিশ্রুতি ছিল নির্ধারিত সময়ে লাভসহ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো অর্থ ফেরত পাননি।
এনার্জিপ্যাকের খসরু জানান, সোবহান নিজেকে বড় নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে তুলে ধরে বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত লেনদেন হয়নি।
মঈন বিশ্বাস জানান, একসময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। বেঙ্গল গ্রুপের মালিক আবুল খায়ের লিটুর নামও অভিযোগে এসেছে—যা প্রমাণ করে, প্রতারণার পরিধি কতটা বিস্তৃত।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ছত্রছায়ায় প্রতারণার বিস্তার : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—আব্দুস সোবহান রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের পিলার–কয়েন প্রতারণা চক্র সক্রিয় থাকার তথ্যও মিলেছে। অভিযোগ উঠছে—এগুলো একটি বৃহৎ নেটওয়ার্কের অংশ, যার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে।

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা : ফেনীর মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী) জানিয়েছেন, তিনি আইনি পথে সমাধান চান। অন্য ভুক্তভোগীরাও বলছেন—নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এই প্রতারণা আরও ভয়াবহ আকার নেবে।
উপসংহার : ফরিদপুরের আব্দুস সোবহানকে ঘিরে এই পিলার–কয়েন কেলেঙ্কারি শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়—এটি আওয়ামী শাসনামলের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ফ্যাসিবাদী দাপটের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
ভুক্তভোগীদের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়—ব্যবসায়িক আস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং পারিবারিক স্থিতি ভেঙে পড়েছে। সঠিক তদন্ত ও কঠোর বিচার ছাড়া এই লুটপাটের চক্র থামবে না—এটাই এখন দেশের সচেতন মহলের দাবি।
