নৌপরিবহন অধিদপ্তরে “পিএস সাম্রাজ্য ” : দশম গ্রেডের এক কর্মকর্তার হাতে বন্দি মহাপরিচালকের দপ্তর !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নৌপরিবহন অধিদপ্তর—যার দায়িত্ব দেশের নৌ নিরাপত্তা, নৌযান নিবন্ধন ও সার্ভে ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানেই এখন আলোচিত এক অদৃশ্য ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, মহাপরিচালকের একান্ত সচিব (পিএস) এস এম আশিকুল ইসলাম কার্যত গোটা দপ্তরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কুক্ষিগত করেছেন। তিনি একজন দশম গ্রেডের কর্মকর্তা। কিন্তু গত প্রায় তিন বছর ধরে মহাপরিচালকের পিএস পদে থেকে এমন দাপট দেখাচ্ছেন—যেন তিনিই দপ্তরের নীতিনির্ধারক।

সাক্ষাৎ মানেই ‘অনুমতির লড়াই’ :  প্রতিদিন নৌযান মালিক, সার্ভে এজেন্ট, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গণমাধ্যমকর্মীরা মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। কিন্তু অভিযোগ—কার সঙ্গে দেখা হবে, কে অপেক্ষা করবে, কে ফিরবেন—সবকিছু নির্ধারণ করেন পিএস আশিকুল ইসলাম।


বিজ্ঞাপন

দর্শনার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা, অসৌজন্যমূলক আচরণ, এমনকি “দেখা হবে না” বলে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।


বিজ্ঞাপন

ক্ষুব্ধ অনেকেই গালাগালি করতে করতে দপ্তর ত্যাগ করেন—যা একটি রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গেও বেয়াদবি  ! সূত্রমতে, প্রায় দুই মাস আগে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা—যিনি বর্তমান মহাপরিচালকের সাবেক সিনিয়র ছিলেন—সাক্ষাৎ করতে এলে তাকেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রেখে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়।

পরে তিনি সরাসরি মহাপরিচালককে ফোন করলে মহাপরিচালক নিজে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ঘটনাটি দপ্তরের ভেতরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ‘অবরুদ্ধ’ : অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মহাপরিচালকের কাছে নিজেদের সমস্যা জানাতে পারছেন না। পিএস তাদের ধমক দিয়ে বের করে দেন বলে দাবি একাধিক কর্মচারীর। তাদের ভাষায়,  “মহাপরিচালক আমাদের অভিভাবক। কিন্তু সেই অভিভাবকের কাছে যেতে দিচ্ছেন না পিএস।” এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বদলী বাণিজ্যের অভিযোগ  :  সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—বদলী, ছুটি ও প্রশাসনিক ফাইল নিয়ন্ত্রণ করার কথা চীফ ইঞ্জিনিয়ার বা প্রশাসনিক শাখার। কিন্তু বাস্তবে এসব ফাইল নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন পিএস নিজেই। কর্মচারীদের অভিযোগ, বদলীর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রধান কার্যালয় থেকে শাহরিয়ার নামে এক কর্মচারীকে নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের একটি লোভনীয় পদে বদলী করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এক লাখ টাকার বিনিময়ে এই বদলী সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী বলেও দাবি উঠেছে।

এছাড়া, নির্বাচনকালীন সময়ে বদলীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও এই বদলীতে সেই বিধি মানা হয়নি বলে অভিযোগ। এমনকি চীফ ইঞ্জিনিয়ার মীর্জা সাইফুর রহমানের মতামতও নাকি নেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে—মহাপরিচালক কী করছেন ?  সূত্রমতে, পিএস আশিকুল ইসলাম কার্যত মহাপরিচালককে ‘ম্যানেজ’ করছেন। ফলে দপ্তরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে এবং যেকোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশবাসীর প্রশ্ন  : সরকারি সেবামূলক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে— কীভাবে একজন দশম গ্রেডের কর্মকর্তা এত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন ? মহাপরিচালক কি বিষয়টি দেখছেন না? নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব কেন নীরব?

অভিযোগ সত্য হলে কার স্বার্থে এই ‘পিএস সাম্রাজ্য’ টিকে আছে?
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে যদি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে—তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো নৌ খাতের সেবায়, নিরাপত্তায় এবং রাষ্ট্রীয় আস্থায়।

এখন দেখার বিষয়—কর্তৃপক্ষ কি এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি ‘পিএস সাম্রাজ্য’ আরও বিস্তৃত হবে?

👁️ 22 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *