দরপত্র ছাড়াই ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার কাজ: গণপূর্তে ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’—কিসের ইশারায় চলল এই দুঃসাহস ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি যেখানে বাধ্যতামূলক, সেখানে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন—এ যেন আইনের বুকের ওপর দিয়েই হেঁটে যাওয়ার দৃষ্টান্ত। অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর বাউন্ডারি ওয়াল উঁচুকরণ, বিচারপতি ভবনে নতুন গেট স্থাপন ও সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর মেরামত এবং নিরাপত্তা গ্রিল স্থাপনের মতো উন্নয়নকাজ দরপত্র আহ্বান ছাড়াই সম্পন্ন করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

কাজ শেষ হওয়ার পর টেন্ডার ডেকে বিল পরিশোধ !  এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনে। একই ধাঁচের ঘটনা ঘটেছে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার-এর গেটের দেয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাট কাজেও। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং দরপত্রের আগে এ ধরনের বিধিবহির্ভূত কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার কাজ—কীভাবে সম্ভব হলো ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ ?  তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুদকের বাউন্ডারি ওয়ালের গ্রিলনেট দিয়ে ১৬ ফুট উঁচুকরণ, মিডিয়া সেন্টারের ভেতরে একাধিক কক্ষ নির্মাণ, একটি ফ্লোরের মেরামত ও সংস্কারসহ নানা কাজে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৬৬ টাকা। কাজের তালিকায় রয়েছে—ফ্লোর নবায়ন, থাইপার্টিশন, দরজা পরিবর্তন, ফলস সিলিং, স্যানিটারি ফিটিংস বদল, নতুন টাইলস বসানো এবং পুরো ভবন রঙ করা।
অন্যদিকে কাকরাইলের ২০ তলা বিচারপতি ভবনের উত্তর পাশে দুটি নতুন গেট স্থাপন, প্রধান চারটি গেটের সংস্কার ও মজবুতকরণ, সীমানাপ্রাচীর ঊর্ধ্বমুখী করে নিরাপত্তা গ্রিল বসানোসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬৯ হাজার ৮২২ টাকা। অভিযোগ—এর একটি অংশের কাজ দরপত্র ছাড়াই শুরু ও সম্পন্ন করা হয়েছে; পরে টেন্ডার ডাকা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

তদন্ত কমিটির প্রশ্ন: “আইনের সুযোগ কোথায় ? ” তদন্ত কমিটির সদস্য, রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. ছাবের আহমেদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এ ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। “তারা সেই কাজটাই করেছেন। কেন করতে হলো—তা খুঁজে বের করতে বলেছি,”—বলেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের চর্চা পুরো বিভাগের ভাবমূর্তি নষ্ট করে।


বিজ্ঞাপন

কমিটির আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “যত তাড়াই থাকুক, একজন প্রকৌশলীকে আইন-কানুন মেনেই কাজ করতে হবে। তারা তা উপেক্ষা করেছেন। জিপি সিস্টেমে কাজ কে পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাহলে যে ঠিকাদার কাজটি করল, সে কীভাবে নিশ্চিত হলো যে পরবর্তী টেন্ডারে তিনিই কার্যাদেশ পাবেন?”

তার ইঙ্গিত আরও গভীরে—“এখানে হয়তো তাকে আগেই এস্টিমেট জানানো হয়েছে। এটাই দুর্নীতি। অথবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর নিকটাত্মীয়। অথবা প্রকৌশলী নিজেই বেনামে ঠিকাদারি করেন। অথবা রাজনৈতিক চাপ ছিল। এর মধ্যে একটি রহস্য অবশ্যই আছে।”

“অনুরোধপত্র পেয়েছি’—গণপূর্তের সাফাই   : গণপূর্ত অধিদপ্তর-এর মেইনটেন্যান্স বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার কবির বলেন, দুদকের সাবেক সচিব খোরশেদা বেগমের অনুরোধপত্র পেয়ে তারা কাজ করেছেন। “তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় কাজ করতে হয়েছে। আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করেছি।” কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—কোন নিয়মে আগে কাজ, পরে টেন্ডার?

সরকারি ক্রয়বিধি কি ‘পরিস্থিতি বিবেচনায়’ স্থগিত রাখা যায়? গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব দপ্তরে না থাকলেও ফোনে স্বীকার করেন, কাজগুলো তারা করেছেন। তবে অনিয়ম হয়েছে কিনা—তা কাগজপত্র না দেখে বলতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেন।

স্বচ্ছতার মুখে তালা, দুর্নীতির দরজা খোলা ? তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকে না; দুর্নীতির পথ সুগম হয়। সরকারি অর্থ ব্যয়ের আগে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক—এটাই আইনের মর্ম। না হলে “শুভংকরের ফাঁকি” থেকে যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এ ঘটনা ঘটেছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নকাজে, যার কাজই হলো দুর্নীতি দমন। সেখানে যদি ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ সংস্কৃতি চালু হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার জন্যও এক বিপজ্জনক বার্তা।

এখন কী ? তদন্ত কমিটি তাদের ফাইন্ডিংস জমা দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্তের পালা গণপূর্ত বিভাগের। প্রশ্ন একটাই—এই কোটি টাকার কাজের নেপথ্যের ‘রহস্য’ উন্মোচিত হবে, নাকি ফাইলের ভাঁজে চাপা পড়ে যাবে ? রাষ্ট্রের অর্থ, রাষ্ট্রের আইন, রাষ্ট্রের জবাবদিহি—সবকিছুর পরীক্ষাই এখন এখানেই।

👁️ 76 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *