নির্বাচনের আয়নায় জাতির মুখ  : বীরদের প্রত্যাখ্যান, না কি বিবেকের পরাজয় ?

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : ইতিহাসের পাতায় বহুবার দেখা গেছে—যারা ঝড়ের রাতে বাতিঘর জ্বালিয়ে রাখে, ভোরের আলো ফুটলে তাদের নামটাই সবচেয়ে আগে ভুলে যাওয়া হয়। আমাদের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল যেন সেই পুরনো ট্র্যাজেডিরই নতুন সংস্করণ। রাজপথে যারা বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল,


বিজ্ঞাপন

অন্ধকার সময়ের বিরুদ্ধে যারা কণ্ঠ তুলেছিল—ভোটের বাক্সে তাদের জন্য কি সত্যিই জায়গা ছিল না? এ প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, মানসিক এবং ঐতিহাসিক।

ত্যাগ বনাম ভোটের অঙ্ক  :  ত্যাগের স্মৃতি কি সত্যিই এত ক্ষণস্থায়ী ? রাজপথের উত্তাল দিনগুলোতে যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন-জীবিকা, ভবিষ্যৎ—সবকিছু বাজি রেখেছিল, আজ তাদের রাজনৈতিক পরিণতি কি কেবল “অবাস্তব আবেগ”-এর খাতায় ফেলা হলো ?


বিজ্ঞাপন

ভোটের রাজনীতিতে আবেগের স্থান কম—এ কথা নতুন নয়। কিন্তু ত্যাগ যদি রাজনৈতিক মূলধন না হয়, তবে গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায় ?


বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্র সংখ্যার খেলা—এটি সত্য। কিন্তু সংখ্যাই কি সব সত্য? নাকি সংখ্যার পেছনে কাজ করে অভ্যাস, নিরাপত্তার লোভ, পরিচিত শক্তির প্রতি নির্ভরতা? মানুষ অনেক সময় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু পরিবর্তনের দায় নিতে চায় না। ফলে পরিচিত সমীকরণই আবার ফিরে আসে।

“গোলামীর মানসিকতা”—অতিরঞ্জন, না বাস্তবতা ? কেউ কেউ এই ফলাফলকে জাতির “স্টকহোম সিনড্রোম” বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তুলনাটি আবেগঘন, কিন্তু তা পুরোপুরি অমূলকও নয়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামো মানুষের মনোজগতে নিরাপত্তার ভ্রম তৈরি করে। মানুষ ভাবে—“যা আছে, তা-ই থাক।” অজানা ঝুঁকির চেয়ে পরিচিত সীমাবদ্ধতাই নিরাপদ মনে হয়।

কিন্তু এও সত্য—ভোটারদের সিদ্ধান্তকে একমাত্র কৃতঘ্নতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হয়। হয়তো মানুষ ত্যাগকে সম্মান করে, কিন্তু শাসনের সক্ষমতা, অর্থনীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা—এসব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। রাজপথের নায়ক আর রাষ্ট্র পরিচালনার নায়ক—দুই ভূমিকার চাহিদা ভিন্ন।

গণতন্ত্র: আবেগ নয়, জবাবদিহির পরীক্ষা : গণতন্ত্র কখনও কেবল অতীতের বীরত্বের পুরস্কার নয়; এটি ভবিষ্যৎ পরিচালনার আস্থার ভোট। যারা লড়েছেন, তাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ভোটের দিন মানুষ দেখে—কে রাষ্ট্র চালাতে পারবে, কে স্থিতিশীলতা দেবে, কে তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।

এখানেই বেদনা—যারা লড়েছে, তারা হয়তো নিজেদের ত্যাগকে যথেষ্ট রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারেনি। আবেগকে সংগঠনে, সংগঠনকে নীতিতে, আর নীতিকে কার্যকর পরিকল্পনায় রূপান্তর করা না গেলে রাজপথের জোয়ার ভোটের স্রোতে টিকে না।

পরাজয় কার? এটি কি সত্যিই বীরদের পরাজয়? নাকি এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মম পাঠ ? সম্ভবত দুটোই। এই ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস কাউকে স্থায়ী কৃতিত্বের সনদ দেয় না। প্রতিটি সময়েই নতুন করে আস্থা অর্জন করতে হয়। জনগণ কখনও কখনও ভুলও করতে পারে—কিন্তু গণতন্ত্রে সেই ভুলের সংশোধনও জনগণের হাতেই থাকে।

সামনে কী ?  ফ্যাসিবাদের আশঙ্কা, অধিকার হরণের ভয়—এসব উদ্বেগকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু হতাশার ভাষা যদি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ না নেয়, তবে তা কেবল ক্ষোভ হিসেবেই থেকে যাবে।

ত্যাগী মানুষরা দূরে সরে গেলে শূন্যতা তৈরি হয়—কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ করার দায়ও তাদেরই, যদি তারা সত্যিই জাতিকে ভালোবাসেন।

শেষ কথা একটাই— একটি নির্বাচনের ফলাফল ইতিহাসের শেষ অধ্যায় নয়। এটি কেবল একটি অধ্যায়ের উপসংহার। ইতিহাস নির্মম, কিন্তু ইতিহাস পরিবর্তনশীলও। যারা লড়েছিল, তাদের সামনে দুটি পথ—অভিমান করে সরে যাওয়া, অথবা নতুন ভাষা, নতুন কৌশল, নতুন আস্থার রাজনীতি নির্মাণ করা।
জাতির বিবেকের বিচার হয় একদিনে নয়, সময়ের দীর্ঘ পরীক্ষায়। আজকের ফলাফল হয়তো তিক্ত, কিন্তু এটিই শেষ সত্য নয়।

👁️ 17 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *