
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে যে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।

অভিযোগের প্রকৃতি : নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন, প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন—এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। সমালোচকদের দাবি, প্রশাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়ে।
প্রশাসনের ভেতরে যদি দলীয় আনুগত্যকে দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে তা একধরনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এতে করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে এবং পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি : প্রশাসন যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হয়— নীতিগত পক্ষপাতিত্ব

দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধি, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, জনআস্থার অবক্ষয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় বারবার বলা হয়েছে,
প্রশাসনের দলীয়করণ শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে। প্রশাসন যখন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারায়, তখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক : বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের ভেতরে অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক বা ‘সিন্ডিকেট সংস্কৃতি’ গড়ে উঠলে তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী। যদি কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এ ধরনের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রশাসনের ভেতরে পেশাগত বিভাজন ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
নাগরিকদের জন্য এর অর্থ কী ? সাধারণ নাগরিকের কাছে প্রশাসন হলো রাষ্ট্রের দৃশ্যমান মুখ। সেবা প্রদান, আইন প্রয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন—সবকিছুতেই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। দলীয় প্রভাব বাড়লে সেবা প্রদানে বৈষম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে পক্ষপাতিত্ব এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিলম্বের মতো সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।

করণীয় কী ? স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা জোরদার করা। প্রশাসনিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা। নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা
উপসংহার : প্রশাসনের দলীয়করণ কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নাগরিক আস্থার প্রশ্ন। রাজনৈতিক দলগুলো পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু প্রশাসন একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। তাই প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ রাখা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
নিরপেক্ষ প্রশাসনই গণতন্ত্রের নিরাপত্তা বলয়। সেই বলয় দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভীত কেঁপে ওঠে—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
