
নিজস্ব প্রতিনিধি, (পিরোজপুর) : মঠবাড়িয়া উপজেলার ২নং উত্তর বড়মাছুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়ম, অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের একাধিক গুরুতর অভিযোগ।

অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ আমিরুল ইসলাম। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর দাবি—তার কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সময়মতো স্কুলে না আসা, আগেই চলে যাওয়া : বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয় খোলা থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, সহকারী শিক্ষক আমিরুল ইসলাম প্রায়ই সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন এবং দুপুর ২টার আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আমিরুলের কাছে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে কৈফিয়ত চাইলে তিনি বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখান। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

শিক্ষার্থীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানোর অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে মোর্চা, কচুর লতি, পেঁপে, আমড়া, দোড়সহ নানা মৌসুমি সবজি আনাতে বাধ্য করেন। কোনো শিক্ষার্থী অস্বীকৃতি জানালে তাদের গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগও করেছেন একাধিক অভিভাবক।
এক ক্ষুব্ধ অভিভাবক বলেন, “একজন শিক্ষকের মুখে এত অশ্রাব্য ভাষা—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিশুরা ভয়ে কিছু বলতে পারে না।” অভিভাবকদের দাবি, এ ধরনের আচরণ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ : বিদ্যালয়ের এক নারী সহকারী শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করে বলেন,
“আমরা মোট ১০ জন শিক্ষক—এর মধ্যে ৭ জন নারী। আমিরুল আমাদের সঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ ও অশোভন আচরণ করেন। মান-সম্মানের ভয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে সাহস পাইনি। আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।” শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অতীত কর্মস্থলেও বিতর্কের ছায়া : স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমিরুল ইসলাম পূর্বে উত্তর বড়মাছুয়া জামতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীন এক ছাত্রীকে নিয়ে অশোভন আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। অভিযোগের পর ওই ছাত্রী ভয়ে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয় বলে দাবি এলাকাবাসীর।
পরে এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে অন্যত্র বদলি করা হয়। পরবর্তীতে সাপলেজা ইউনিয়নের উত্তর-পূর্ব খেতাছিড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েও তিনি নতুন করে বিতর্কে জড়ান। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির বাগান থেকে পেঁপে চুরির ঘটনায় তিনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে সভাপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হয়।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও দাবি : অভিভাবক ও এলাকাবাসীর বক্তব্য—“এ ধরনের অভিযোগযুক্ত শিক্ষক বিদ্যালয়ে বহাল থাকলে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটবে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।” তারা জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য মেলেনি : অভিযুক্ত শিক্ষক আমিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের অপেক্ষায় পুরো এলাকা : একদিকে অনিয়মিত উপস্থিতি, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও অতীত বিতর্ক—সব মিলিয়ে ২নং উত্তর বড়মাছুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন— কবে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত? আর কবে ফিরবে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ?
