
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীসহ দেশের প্রায় তিন হাজার স্পটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি—এমন অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, হকার ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

অভিযোগের তীর দুর্নীতিবাজ পুলিশের একটি অংশ এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের দিকে। প্রশ্ন উঠছে—এই টাকার পাহাড় কোথায় যাচ্ছে? আর দেখার কি সত্যিই কেউ নেই?
চাঁদার খাত: রাস্তা, বাজার, পরিবহন, নির্মাণ—সবখানেই ‘রেট’ নির্ধারিত : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর ফুটপাত, কাঁচাবাজার, বাস টার্মিনাল, ট্রাক স্ট্যান্ড, নির্মাণ প্রকল্প, এমনকি সরকারি দপ্তরের সামনেও রয়েছে নির্ধারিত ‘রেট’।
ফুটপাতের দোকান: দৈনিক ২০০–১০০০ টাকা, কাঁচাবাজারের আড়ত: প্রতিদিন ৫০০–৫,০০০ টাকা, পরিবহন খাত : প্রতি ট্রিপে নির্দিষ্ট অঙ্ক, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন: গাড়ি প্রতি আলাদা চাঁদা : ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, টাকা না দিলে হয় উচ্ছেদ, নয়রাতের আঁধারে হামলা, কিংবা মিথ্যা মামলা। কেউ মুখ খুলতে চান না প্রকাশ্যে; কারণ “উপরে লাইন আছে”—এমনটাই দাবি একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর।

কারা জড়িত ? ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে টাকা তোলে, আর একটি অংশ যায় দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের কাছে ‘ম্যানেজমেন্ট’ খাতে। সংশ্লিষ্ট শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় ইউনিটের কয়েকজন

প্রভাবশালীর নাম ঘুরছে অভিযোগে : যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—“নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যখন প্রতিদিনের লেনদেন প্রকাশ্য গোপন রহস্য, তখন অভিযোগের অপেক্ষা কেন?
প্রতিদিন ১০০ কোটি—হিসাবটা কীভাবে ? অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি ৩ হাজার স্পটে গড়ে প্রতিদিন ৩–৪ লাখ টাকা করে ওঠে, তাহলে মোট অঙ্ক সহজেই ৯০–১২০ কোটির মধ্যে দাঁড়াতে পারে। এই বিপুল অর্থের কোনো কর নেই, হিসাব নেই, জবাবদিহি নেই—ফলে এটি কালো অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
প্রশাসনের নীরবতা, নাকি অদৃশ্য শক্তি ? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগেই এই চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট বছরের পর বছর টিকে আছে।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ : এক পরিবহন শ্রমিক বলেন, “দিন শেষে যা আয় করি, তার বড় অংশই চলে যায় চাঁদায়। না দিলে গাড়ি চলে না।” এক হকারের ভাষায়, “আমরা অবৈধ না, পেটের দায়ে বসি। কিন্তু প্রতিদিন টাকা দিতে দিতে শেষ।”
সমাধান কোথায় ? বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব, সকল বাজার ও পরিবহন খাতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও পেমেন্ট ব্যবস্থা, থানা ও রাজনৈতিক ইউনিটভিত্তিক স্বাধীন তদন্ত, হটলাইন ও গোপন অভিযোগ ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আজও হচ্ছে না।
চাঁদাবাজির এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়—রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর এক গভীর আঘাত। প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকা যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাতবদল হয়, তবে সেটি দেশের উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের জন্য ভয়াবহ বার্তা। প্রশ্ন একটাই—এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের শেষ কোথায়?
