গণপূর্তে ‘মাছের খামার’ রহস্য : ৮০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদে দুদকের চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত আমিনুল

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মোঃ আমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।


বিজ্ঞাপন

প্রজ্ঞাপন নং-২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০০২.১৮-২০, তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এ বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় আদালত ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে চার্জশিট গ্রহণ করায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৯(২) অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।

মামলার পটভূমি: সম্পদ বিবরণীতে ‘মাছের আয়’ ১ কোটির বেশি !   দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, মামলা নং-১৬ (তারিখ: ২৫/০৯/২০২৩)–এ তদন্ত শেষে চার্জশিট নং-২৩ (তারিখ: ২০/০৩/২০২৫) দাখিল করা হয়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ—মোঃ আমিনুল ইসলাম (৪৩/৪৫), উপ-সহকারী প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭ (সাবেক), ঢাকা; বর্তমান কর্মস্থল টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগ—নিজ সম্পদ বিবরণীতে ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে মোট ১,০৪,১৪,৭৬০ টাকা আয় দেখান।


বিজ্ঞাপন

তদন্তে বলা হয়, ১৯০ একর পুকুর শ্রেণীর জমি (বাৎসরিক ৩০,০০০ টাকা চুক্তি, ৫ বছর) এবং পরবর্তীতে ১.৭০ ও ১.৯০ একর পুকুর—এভাবে একাধিক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিজ নেওয়ার দাবি করা হয়। কাগজে-কলমে ৬ বছরে মাছ বিক্রি থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ১৯–২০ লাখ টাকা করে আয় দেখানো হয়েছে।

তদন্তে গড়মিল: আয়কর রিটার্ন নেই, উৎপাদন-ব্যয়ের রেকর্ডও না  !  দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অসঙ্গতি উঠে আসে— ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্নের তথ্য মেলেনি, কেবল ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের নথি পাওয়া যায়। কর সার্কেল-৭৬ (বৈতনিক), কর অঞ্চল-০৪, ঢাকা—এর সহকারী কর কমিশনার লিখিতভাবে রিটার্ন না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরিদর্শনে দেখা যায়, পুকুরে নিবিড় মাছ চাষের প্রমাণ, উৎপাদন-বিক্রির হিসাব, পোনা/খাদ্য/শ্রমিক ব্যয়ের রেকর্ড—কোনোটিই উপস্থাপন করা যায়নি।

উল্লেখিত ১.৯০ একর পুকুরের বাস্তব পরিমাণ খতিয়ান অনুযায়ী প্রায় ৭৬ শতাংশ পাওয়া যায়—অর্থাৎ আয় দেখানোর সঙ্গে জমির পরিমাণে অসামঞ্জস্য।

সম্পদের হিসাব-নিকাশ : ৮০,৮১,০২৩ টাকা ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ : 
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদ ১,২৭,৩৫,৭২১ টাকা; পারিবারিক ব্যয় ১২,০০,৫৯৪ টাকা বাদে নিট সম্পদ ১,৫৯,০৬,০১৫ টাকা ধরা হয়। গ্রহণযোগ্য আয় ৫৮,৫৫,২৯২ টাকা বিবেচনায় ৮০,৮১,০২৩ টাকা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মত দেয় দুদক। এ প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

জব্দ তালিকা ও সাক্ষ্য: কর নথি উদ্ধার  : ২৯/০২/২০২৪ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পুরাতন ভবন (সেগুনবাগিচা) থেকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের আয়কর রিটার্নের কপি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র জব্দ করা হয়। অফিস সহকারী ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিকদের জবানবন্দীতে রিটার্ন অনুপস্থিতির বিষয়টি পুনরায় উঠে আসে। জব্দতালিকা প্রস্তুত করে নথি জিম্মায় নেওয়া হয়।

আদালতের গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ : চার্জশিট ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে আদালতে গৃহীত হওয়ার পর ২৩/০২/২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয় সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।”

বড় প্রশ্নগুলো : কাগজে-কলমে দেখানো কোটি টাকার মাছের আয়—বাস্তবে তার প্রমাণ কোথায়  ?  টানা চার করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনুপস্থিত কেন ? জমির পরিমাণে গড়মিল থাকলে আয় গণনায় কীভাবে এত উচ্চ অঙ্ক দেখানো হলো ? গণপূর্তের একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলী পদে থেকে এমন সম্পদ বৃদ্ধির উৎস কী ?
এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন আদালতের বিবেচনায়।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ড, আর প্রমাণিত না হলে অব্যাহতি—দুই পথই খোলা। তবে ‘মাছের খামার’ ঘিরে কোটি টাকার এই আর্থিক রহস্য ইতোমধ্যেই গণপূর্ত অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে।

👁️ 104 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *