
বিশেষ প্রতিবেদক : হাদি আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার উচ্চারিত বাক্যগুলো এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিধ্বনি তুলছে। জীবিত অবস্থায় তিনি ছিলেন বিতর্কিত, তীক্ষ্ণভাষী, আপসহীন। মৃত্যুর পর তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতীক—কারও কাছে প্রতিবাদের, কারও কাছে অস্থিরতার, কারও কাছে অসমাপ্ত এক রাজনৈতিক প্রকল্পের নাম।

এই লেখায় আমরা আবেগ নয়, রাজনৈতিক অভিঘাতের দিক থেকে “মৃত হাদি”-র বক্তব্যগুলোর প্রভাব বিশ্লেষণ করছি।
সেনাপ্রধানকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ : রাষ্ট্রশক্তির সামনে জনতার সমীকরণ : সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ্জামান–এর উদ্দেশে তার সেই বহুল আলোচিত চ্যালেঞ্জ—“সাহস থাকলে ক্যু করে দেখান”—ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে এক অবস্থান।
মৃত্যুর পর এই বক্তব্য নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সমর্থকদের মতে, তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাকে জনতার শক্তি দিয়ে মোকাবেলার বার্তা দিয়েছিলেন। সমালোচকদের মতে, এমন ভাষা রাষ্ট্র–রাজনীতির ভারসাম্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কিন্তু অস্বীকার করা যায় না—তার এই উচ্চারণ ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

অন্তর্বর্তী শাসন ও উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ : ইন্টেরিম উপদেষ্টাদের উদ্দেশে তার বক্তব্য—“জুলাই বিক্রি হয়ে গেছে”—মৃত্যুর পর আরও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে হাদি আসলে আন্দোলনের ‘নৈতিক মালিকানা’ প্রশ্ন তুলেছিলেন। আন্দোলন কি রাস্তায় ছিল, না কি আলোচনার টেবিলে গিয়ে তার চরিত্র বদলেছে?
এই প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। আর হাদির মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরও আবেগময় করে তুলেছে।
বিএনপিকে বার্তা ও ঐতিহ্য বনাম বর্তমান কৌশল : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর প্রতি তার সতর্কবার্তা ছিল ঐতিহাসিক স্মৃতির আহ্বান। “শহীদ জিয়ার দলকে দাস বানাতে দেবো না”—এই বাক্যে তিনি দলটির জাতীয়তাবাদী পরিচয়কে সামনে টেনে আনেন। এটি সরাসরি আক্রমণ নয়; বরং দলটির ভেতরের আদর্শিক টানাপোড়েনকে উসকে দেওয়া। মৃত্যুর পর এই বক্তব্য বিএনপির ভেতরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে—দল কোন পথে যাবে?
জামায়াত ও আদর্শের প্রশ্ন : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–কে উদ্দেশ করে তার বক্তব্য ছিল আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতির দ্বন্দ্ব নিয়ে। হাদি প্রশ্ন তুলেছিলেন—আদর্শের কথা বলে কি কৌশলগত সমঝোতা করা যায়? তার মৃত্যু এই বিতর্ককে থামায়নি; বরং আরও তীক্ষ্ণ করেছে।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে ব্যতিক্রমী অবস্থান : সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল আওয়ামী লীগ–সম্পর্কে তার মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন—যারা গুরুতর অপরাধে জড়িত নয়, তাদের সাথেও ইনসাফ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি ছিল অস্বাভাবিক সুর। এখানে হাদি নিজেকে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের পক্ষে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর পর এই অবস্থান তাকে ‘কঠোর কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক’ রাজনীতির প্রতীক বানিয়েছে।
ঢাকা–৮: প্রতিদ্বন্দ্বীকেও “ভাই” ঢাকা–৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা আব্বাস ও হেলাল উদ্দীন–কে “ভাই” বলে সম্বোধন—এটি ছিল প্রচলিত শত্রুতার রাজনীতির বাইরে এক বার্তা। রাজনীতি মানেই ব্যক্তিগত বৈরিতা নয়—এই ধারণা তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার মৃত্যু সেই বার্তাকে আরও মানবিক রূপ দিয়েছে।
সংখ্যালঘু রাজনীতির নতুন বিতর্ক : হাদির প্রস্তাব—হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম—একদিকে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তোলে, অন্যদিকে বিভাজনের আশঙ্কাও তৈরি করে। মৃত্যুর পর তার সমর্থকেরা এটিকে “রাজনৈতিক মর্যাদা”র দাবি বলছেন; সমালোচকেরা বলছেন, এটি বহুত্ববাদী কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
বিচার ও ঐতিহাসিক ক্ষতের পুনরুত্থান : তিনি যে বিচারগুলোর দাবি তুলেছিলেন— ৫৭ বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ৫ মে শাপলা ট্র্যাজেডি, জুলাইয়ের নিহতদের বিচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজি—এসব এখন নতুন করে আলোচনায়। তার মৃত্যু এসব দাবিকে থামায়নি; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে—তারা কি এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেবে?
হাদি : ব্যক্তি না প্রতীক ? মৃত্যু রাজনীতিতে অনেক সময় শেষ নয়, শুরু। হাদি জীবিত অবস্থায় ছিলেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া এক কণ্ঠস্বর। মৃত্যুর পর তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতীক—আপসহীন ভাষার ন্যায়বিচারের দাবির ক্ষমতার কেন্দ্রকে অস্বস্তিতে ফেলার সাহসের।
প্রশ্ন হলো—তার অসমাপ্ত রাজনৈতিক প্রকল্প কি সংগঠিত রূপ পাবে? নাকি তিনি স্মৃতি, আবেগ আর সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বেন ? একটি বিষয় স্পষ্ট— মৃত হাদি এখন কেবল অতীত নন। তিনি বর্তমান রাজনীতির ওপর ভাসমান এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।
