
আজকের দেশ ডটকম ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। সামরিক শক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়—বরং অর্থনৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েই এবার ময়দানে নেমেছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক নীরব যুদ্ধ—যার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন ডলার।

টার্গেট: পেট্রো-ডলার, লক্ষ্য: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি : দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “পেট্রো-ডলার” ব্যবস্থা। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে তেল বাণিজ্যকে ডলারের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। ফলে তেল কিনতে বাধ্য হয়ে পুরো বিশ্ব ডলারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থাই যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে তিনটি বড় সুবিধ, এর মধ্যে, বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে আধিপত্য, কম সুদে বিপুল ঋণ নেওয়ার সুযোগ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু এখন সেই ভিত্তিতেই আঘাত হানছে ইরান।
চুক্তির মেয়াদ শেষ, বদলে যাচ্ছে খেলার নিয়ম : ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি তেল চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব এখন ডলার ছাড়াও অন্যান্য মুদ্রায় তেল বিক্রির পথ খুলে দিয়েছে। একই সময়ে, চীন ও রাশিয়া ডলার বাদ দিয়ে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে, ব্রিকস দেশগুলো বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম তৈরিতে এগোচ্ছে, তেলের বাজারে ‘মাল্টি-কারেন্সি’ প্রবণতা বাড়ছে, একে অনেকেই বলছেন– ডি-ডলারাইজেশনের সূচনা।

ইরানের কৌশল : সরাসরি যুদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক চাপ : বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝে গেছে -+ সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো কঠিন। তাই তারা নিয়েছে “অপ্রতিসম যুদ্ধ” কৌশল। প্রধান কৌশলগুলো হলো – হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ব তেলের প্রায় ২০% এই পথ দিয়ে যায়, ডলার এড়িয়ে তেল বিক্রি : ইউয়ানসহ বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার,, প্রক্সি নেটওয়ার্ক: মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, সস্তা ড্রোন বনাম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা: অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করা। একটি তথ্য এখন আলোচনায়— একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে খরচ করতে হচ্ছে কোটি কোটি ডলার !

হরমুজ প্রণালী: নতুন ‘চোক পয়েন্ট’ : ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে: জাহাজ চলাচলে টোল আদায়, নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা, কৌশলগত দেশগুলোকে ছাড়, এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
মাঠে সামরিক উত্তেজনাও বাড়ছে : ২০২৫–২০২৬ সালে সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে:, মধ্যপ্রাচ্যে ১৯টির বেশি মার্কিন ঘাঁটি টার্গেট, একাধিক বিমানঘাঁটি ও নৌঘাঁটিতে হামলা এবং হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার, ইরানের “মোজাইক ডিফেন্স” কৌশল তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ব্রিকস ফ্যাক্টর: ডলারের বিকল্প তৈরি হচ্ছে ? ব্রিকস জোট এখন বড় ভূমিকা রাখছে: নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম তৈরির উদ্যোগ, সম্ভাব্য নতুন মুদ্রা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সফল হলে ডলারের একক আধিপত্য বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বাস্তবতা কী বলছে ? যদিও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে রাখা জরুরি: ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে।
শেষ কথা : যুদ্ধের নতুন রূপ -এই সংঘাত আর শুধু বোমা-ক্ষেপণাস্ত্রের নয়— এটি অর্থনীতি, মুদ্রা ও বাণিজ্যের যুদ্ধ। ইরান চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত কাঁপাতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া।
প্রশ্ন এখন একটাই: ডলারের রাজত্ব কি সত্যিই চ্যালেঞ্জের মুখে, নাকি এটি শুধু সাময়িক চাপ ?
