
নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যেন অদৃশ্য এক সম্রাটের উত্থান। পদে তিনি একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা, কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তিতে যেন পুরো দপ্তরের নিয়ন্ত্রক।

সহকারী পরিচালক (গোট ফার্মস) ডা. মো. কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে উঠেছে বিস্ময়কর, চাঞ্চল্যকর এবং ভয়ংকর সব অভিযোগ।
একদিকে সরকারি দায়িত্ব, অন্যদিকে ঠিকাদারি ব্যবসা—দুই হাতেই চলছে ক্ষমতা ও অর্থের খেলা। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা।

এক ব্যক্তি, দুই দপ্তর—নিয়ম কি শুধু সাধারণদের জন্য ? সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে কর্মরত থাকার পাশাপাশি একইসঙ্গে অধিদপ্তরের উৎপাদন শাখার সহকারী পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন ডা. কবির উদ্দীন।

সরকারি বিধিমালায় দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থান নিরুৎসাহিত করা হলেও তিনি প্রায় দেড় দশক ধরে একই বলয়ে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে—কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই এলাকায় থেকে একাধিক দপ্তর নিয়ন্ত্রণ করছেন?
চাকরির আড়ালে ‘ঠিকাদার কবির ’! অভিযোগের সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশ হলো—সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান “মেসার্স এস কে ট্রেডার্স”-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প পরিচালক ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিত কার্যাদেশ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রেখে সেখান থেকেই পরিচালিত হয় টেন্ডার ও ঠিকাদারি কার্যক্রম।
প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে একজন ব্যক্তি একইসঙ্গে ঠিকাদার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রক এবং প্রশাসনিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হন ?
তাহলে কি সরকারি অফিসই পরিণত হয়েছে ব্যক্তিগত ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে ? টেন্ডার সিন্ডিকেটের ‘গডফাদার ’?
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সুযোগে ডা. কবির গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কেউ কাজ পাওয়ার সাহস করেন না।
অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্বয়ং ডা. কবির। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, “কবির সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া এখানে কোনো কাজ পাওয়া যায় না। সব কিছু আগেই ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়।”
রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি !
অধিদপ্তরের ভেতরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগ—চাঁদাবাজি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, দিবস ও বিশেষ আয়োজনের নামে প্রকল্প ও দপ্তর থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।
সর্বশেষ বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রশ্ন উঠছে—এ অর্থ কোথায় গেছে ? কারা এর সুবিধাভোগী ? আর প্রশাসন কেন নীরব ? সরকারি ওষুধ কি গেল ব্যক্তিগত ব্যবসায় ? নারায়ণগঞ্জ জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ ও ভিটামিন খামারিদের বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেগুলো সঠিকভাবে বিতরণ না করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার ও বিক্রি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিতরণ তালিকা যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে ভয়ংকর অনিয়মের চিত্র। খামারিদের অভিযোগ, “সরকারি ওষুধ গরিব খামারিদের কাছে পৌঁছানোর আগেই গায়েব হয়ে যায়।”
৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা, অথচ অঢেল সম্পদের মালিক !
একজন ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও ঢাকায় বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম ও প্রভাব খাটিয়েই গড়ে উঠেছে এই সম্পদের পাহাড় । দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে এখন প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য আছে কি ?
রাজনৈতিক রং বদলে টিকে থাকার অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, সময় ও পরিস্থিতি বুঝে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নিজেকে নতুন বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করেন ডা. কবির। এভাবেই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী রেখেছেন তিনি। ফলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয়, ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
অভিযোগ উঠলেই ফোন বন্ধ ! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেই সরকারি নম্বর বন্ধ করে দেন ডা. কবির উদ্দীন। এবারও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ নীরবতা ঘিরে এখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নীরবতা কি দোষ স্বীকারের ইঙ্গিত? নাকি প্রভাবশালী ছত্রচ্ছায়ায় দায়মুক্তির কৌশল?
নীরব প্রশাসন, ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা : এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রহস্যজনক নীরবতা ক্ষোভ বাড়িয়েছে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে।
তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, “এখনই কবির সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরা না গেলে পুরো অধিদপ্তর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।”
