
নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) মো. শামছুদ্দোহাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং পিআরএলে যাওয়ার আগে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিসিএস পাবলিক ওয়ার্কস ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তিনি এমন এক ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট, যারা প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট বণ্টন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও প্রকল্প বাণিজ্যের অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শামছুদ্দোহার নিয়ন্ত্রণাধীন সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছে। এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র অনুমোদন দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি আবাসন প্রকল্পের দরপত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে ময়মনসিংহ জোনে দায়িত্বে থাকাকালে মডেল মসজিদ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের এপিপি বরাদ্দ ও প্রাক্কলন অনুমোদনে অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসে। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিটি ধাপেই কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল নড়ত না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সৎ ও নিরীহ কর্মকর্তারা।

অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শামছুদ্দোহা দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, বসুন্ধরা ও বারিধারায় তাঁর নামে-বেনামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থাকার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বিশাল এলাকাজুড়ে আলিশান বাড়ি ও রিসোর্ট নির্মাণের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। দুর্নীতির অর্থ বিদেশে পাচার করে সেখানে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ হয়নি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘ফ্যাসিবাদী নেটওয়ার্ক’ এর অভিযোগ : অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন। আনন্দ মোহন কলেজ ও বুয়েট ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মহলে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সীর আত্মীয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে অধিদপ্তরে কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন তিনি।
নারী কেলেঙ্কারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ : শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে শামছুদ্দোহার বিরুদ্ধে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও অধিদপ্তরের ভেতরে এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।
পিআরএলের আগে ‘শেষ লুটপাট’ ? অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আর মাত্র দুই মাস পর পিআরএলে যাওয়ার কথা থাকায় বর্তমানে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন শামছুদ্দোহা। চাকরির শেষ সময়ে এসে দ্রুত আখের গোছাতেই তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অতি সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলে তদবির চালালেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি বলেও জানা গেছে।
দুদকের তদন্ত দাবি : গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী কেলেঙ্কারি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে মো. শামছুদ্দোহার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
