দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ, হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম : বিআইডব্লিউটিএ’র ‘অপ্রতিরোধ্য’ আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সারাদেশ

প্রভাবশালী প্রকৌশলী আইয়ুব আলী।নিজস্ব প্রতিবেদক :  বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর এক সময়ের প্রভাবশালী প্রকৌশলী আইয়ুব আলীকে ঘিরে এখন বিস্ফোরক সব অভিযোগে উত্তাল সংশ্লিষ্ট মহল। টেন্ডার বাণিজ্য, ড্রেজিং প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বিদেশে সম্পদ গড়া থেকে শুরু করে অর্থ পাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দুর্নীতির এক ভয়াবহ সাম্রাজ্যের চিত্র।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আইয়ুব আলী। সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি এমন এক অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে তার ইশারা ছাড়া নাকি বড় কোনো প্রকল্পই এগোতো না।

রাজনৈতিক পরিচয়কে ‘ঢাল’ বানানোর অভিযোগ  : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস- পরবর্তীতে সংসদ সদস্য) সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করেন আইয়ুব আলী।


বিজ্ঞাপন

যদিও সরাসরি পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবে অভিযোগ—এই পরিচয়কেই তিনি ভয়-ভীতি ও প্রভাব তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফলে সংস্থার ভেতরে অনেক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। বদলি, পদোন্নতি আটকে দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় সবসময় কাজ করত বলে অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

ড্রেজিং প্রকল্পে ‘৭০০ কোটি টাকার রহস্য’ :  সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে ড্রেজিং প্রকল্প ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়েছে, যার বড় একটি অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়। আর এই অতিরিক্ত অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, ড্রেজিং প্রকল্পকে ঘিরে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে গড়ে ওঠে এক ভয়ংকর কমিশন বাণিজ্য।

‘পছন্দের ঠিকাদার’কে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ  :
বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড ও কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হতো যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়।

কখনও প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো, কখনও দরপত্রে কারসাজি—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

প্রয়োজন নেই, তবুও কোটি কোটি টাকার টার্মিনাল  !
শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা। অভিযোগকারীরা বলছেন, বিদ্যমান টার্মিনালগুলোই পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছিল না, সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ—প্রতিটি পল্টুনের দাম বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জনস্বার্থ নয়, কমিশনভিত্তিক সিদ্ধান্তই ছিল এই প্রকল্পের মূল চালিকা শক্তি।

জলযান ক্রয়ে ‘হাজার কোটি টাকার লুটপাট’  ? ড্রেজার, টাগ বোট, হাউজ বোট, সার্ভে ভেসেল, পাইপলাইনসহ নানা সরঞ্জাম কেনায়ও উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে— কিছু ড্রেজার অল্প সময়েই বিকল হয়ে পড়ে, কিছু জলযান বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, কাগজে দেখানো কিছু পাইপলাইনের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম কিনে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে।

মেরামত কাজে ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’ : যান্ত্রিক শাখায় দায়িত্ব পালনকাল থেকেই কেনাকাটা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও জলযান মেরামতে অনিয়মের অভিযোগ ছিল আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে।
একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সরকারি জলযান মেরামতের কাজ নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো। অনেক ক্ষেত্রে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল, কোথাও কাজ না করেই কাগজে সমাপ্ত দেখানো, আবার কোথাও নিম্নমানের কাজের বিল পাস—এসব অভিযোগও সামনে এসেছে।

‘ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না’ :  ঠিকাদারদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের দাবি, বিল অনুমোদন, ওয়ার্ক অর্ডার কিংবা টেন্ডারসংক্রান্ত নথি এগোতে হলে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী— টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হতো
অযথা দেরি করা হতো  নানা অজুহাতে নথি ফেরত দেওয়া হতো, এতে সৎ ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

একই কাজের নামে একাধিক পক্ষ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ  : কিছু ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, একই কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক পক্ষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো, পরে পছন্দের কাউকে কাজ দেওয়া হতো।

ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা দপ্তরে গিয়ে টাকা ফেরত দাবি করলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমনকি তাকে মারধরের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

রাজধানীজুড়ে সম্পদের পাহাড়  ! দুর্নীতির টাকায় বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও কম নয়। বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে—ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তথ্য।

অভিযোগ অনুযায়ী— বসুন্ধরায় বহুতল ভবন নির্মাণাধীন, ধানমণ্ডি ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট, পূর্বাচল ও আশুলিয়ায় প্লট, আফতাবনগরে জমি, মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকায় সম্পদ, এসব সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, সন্তান কিংবা আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রামেও কোটি টাকার সাম্রাজ্য  : শুধু রাজধানী নয়, গ্রামাঞ্চলেও নাকি বিস্তৃত হয়েছে আইয়ুব আলীর বিনিয়োগ সাম্রাজ্য।

অভিযোগ রয়েছে— সাভারে গরুর খামার, আশুগঞ্জে মুরগির খামার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, যশোর অঞ্চলে কৃষিজমি ও মাছের ঘের, বিদেশে বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও অর্থ পাচারের অভিযোগ, সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার নিয়ে।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি— ২০২১ সালে লন্ডনে বাড়ি কেনা হয়, ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়  অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেদের নামে বাড়ি রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কমিশনের টাকা পাচার করা হয়েছে। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

সরকারি চাকরির বেতনে এত সম্পদ কীভাবে  ?
সমালোচকদের প্রশ্ন—একজন সরকারি প্রকৌশলীর বেতন-ভাতা দিয়ে কীভাবে এত বিপুল সম্পদ, বহুমূল্য গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসী জীবনযাপন সম্ভব? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মহলেও।

অভিযোগের পরও কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে ?  সংস্থার অভ্যন্তরীণ অনেকের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদেই বছরের পর বছর অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে ছিলেন আইয়ুব আলী। সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

দুদকের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন : দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—এত বিস্ফোরক অভিযোগের পরও তদন্তে ধীরগতি কেন? রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণেই কি অনেক অভিযোগ ‘ফাইলবন্দি’ হয়ে আছে?

অভিযোগ অস্বীকার  : আইয়ুব আলী অতীতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি নিজেকে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দাবি করে অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সমালোচকদের বক্তব্য—শুধু অস্বীকার নয়, সম্পদের উৎস, প্রকল্প ব্যয় এবং বিদেশে সম্পদের তথ্য প্রকাশ করে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।

একজন নয়, পুরো সিস্টেম তদন্ত করুন’ :  বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অভিযোগ চলতে থাকাটা শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়—এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি— নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা, দেশ-বিদেশে সম্পদের অনুসন্ধান, টেন্ডার ও প্রকল্প ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট, জড়িত কর্মকর্তা এবং ঠিকাদার ও প্রভাবশালী মহলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরের অনেকেই বলছেন, শুধু একজনকে সরিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে এমন অভিযোগ ভবিষ্যতেও থেকেই যাবে।

👁️ 70 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *