যমুনা রেলওয়ে সেতুতে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ : দুদকের অনুসন্ধানে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ; অডিটে ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ও যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান।

 


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক : অনিয়ম-দুর্নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দেশের অন্যতম লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ে।

বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে নতুন করে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ‘যমুনা রেলওয়ে সেতু’ নির্মাণকে কেন্দ্র করে।


বিজ্ঞাপন

প্রকল্পটিতে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিরিক্ত ব্যয়, কর ফাঁকি এবং ঠিকাদারপ্রীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ও যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


বিজ্ঞাপন

দুদকের অনুসন্ধান শুরু  : ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট দুদকের জারি করা এক দাপ্তরিক পত্রে জানানো হয়, আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. ইমরান আকনকে।

দুদকের পত্রে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, ঠিকাদারের মাধ্যমে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানের স্বার্থে “যমুনা রেলওয়ে সেতু” প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, আর্থিক বরাদ্দ, টেন্ডার ডকুমেন্ট, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, বিল-ভাউচারসহ সংশ্লিষ্ট সব নথির সত্যায়িত অনুলিপি দুদকে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখা-২ এর ২০২৪-২৫ নিরীক্ষা বছরের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য।

সেখানে বলা হয়, সেতু নির্মাণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে SPSP (Steel Pipe Sheet Pile) প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করায় সরকারের প্রায় ৭ হাজার ৪৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

৩০ অক্টোবর ২০২৫ জারি করা ওই দাপ্তরিক পত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের শুরু থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ-০৩ এ এই অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। অডিটে আরও বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে অডিটি দপ্তরের ব্যাখ্যা, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের সুপারিশ এবং সচিব পর্যায়ের মতামতসহ নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

ভুয়া বিল-ভাউচার ও মাপজোক ছাড়াই শত কোটি টাকা পরিশোধ : বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফ্যাপাড)-এর ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক অর্থবছরেই প্রায় ৭০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ব্যয় অডিট আপত্তির মুখে পড়ে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—ডিটেইল মেজারমেন্ট শিট (ডিএমএস), অনুমোদিত ড্রয়িং এবং বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) ছাড়াই প্রায় ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা। একই সঙ্গে রিপ্লেসমেন্ট কনসালটেন্টের নামে আরও ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার অনিয়মিত বিল পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভ্যাট-ট্যাক্সে ভয়াবহ অনিয়ম  : অডিট নথিতে ভ্যাট-ট্যাক্স ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী— যথাযথ ভাউচার ছাড়াই সিডি-ভ্যাট বাবদ প্রায় ৩৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবহার না হওয়া SPSP-এর বিপরীতে প্রায় ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা শুল্ক-ভ্যাট দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ১৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

সিডি-ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত প্রায় ১১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা আয়কর কম কাটা হয়েছে। রিটেনশন বিল থেকে ভ্যাট-আয়কর কর্তন না করায় আরও প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে।

কাজ শেষ না হলেও জরিমানা হয়নি  : অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ডিলে ড্যামেজ আরোপ করা হয়নি। এতে সরকারের প্রায় ৯৯ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া মোবিলাইজেশন ও ডিমোবিলাইজেশন খাতে প্রায় ৪ হাজার ১৫২ কোটি জাপানি ইয়েন, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ব্যয়কে “বিশেষ পর্যবেক্ষণ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফ্যাপাড। একই খাতে প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি ছাড়া আরও প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

অতিরিক্ত দর, নেগোশিয়েশন ও ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি  : ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিশেষ ফিন্যান্সিয়াল ইন্সপেকশন প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তিতে নির্ধারিত দেশ থেকে পণ্য আমদানি না করেই প্রায় ৪০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। Country of Origin যাচাই ছাড়াই অর্থ ছাড়ের অভিযোগও রয়েছে।

অতিরিক্ত SPSP আমদানির মাধ্যমে প্রায় ১০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা শুল্ক-ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে। কাস্টমস হাউসের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে সিডি-ভ্যাট আদায়ের নামে আরও ৪৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে।

অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন প্যাকেজে অস্বাভাবিক উচ্চ দর ধরে কাজ প্রদান করায় সরকারকে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ইউনিট রেট বাড়িয়ে নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির অভিযোগও আনা হয়েছে।

নিম্নমানের কাজেও কোটি কোটি টাকার বিল  : অডিটে উল্লেখ করা হয়, রেল ট্র্যাকে ৬০ মি.মি ব্যালাস্টের পরিবর্তে ৯০ মি.মি পর্যন্ত বড় ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করেও ৪৫ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া নন-টেন্ডার কাজ দেখিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও উঠে এসেছে।

প্রকৌশলীদের আপত্তি উপেক্ষা  : অডিট নথি অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা একাধিক ক্ষেত্রে কম দর প্রস্তাব, কাজের পরিমাপ পুনঃযাচাই কিংবা ব্যয় কমানোর সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু প্রকল্প পরিচালকের হাতে লেখা নোটে উচ্চ দর বজায় রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়।

তার মন্তব্যে উঠে আসে— “প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত কাজ শেষ করা জরুরি”,  “দর কমালে কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে”, এবং “ঠিকাদারকে বারবার দর কমাতে বললে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হবে।”

কমিশন বাণিজ্য ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ  : দুদকে অভিযোগকারী মো. ইয়াছিন আরাফাত দাবি করেন, বিগত সরকারের প্রভাব ব্যবহার করে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়, জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তিনি সিনিয়র কর্মকর্তাদের টপকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদোন্নতি পান।

এছাড়া তার পছন্দের কিছু ঠিকাদার ছাড়া অন্য কাউকে সহজে কাজ দেওয়া হতো না বলেও অভিযোগ রয়েছে। আত্মীয়দের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।

যুগ্ম মহাপরিচালক (প্রকৌশল) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৫ শতাংশ কমিশন এবং “Construction of 3rd and 4th Dual Gauge Line of Dhaka-Tongi Section and Dual Gauge Double Line in Tongi-Joydevpur Section Project” থেকে প্রায় ৭ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

সম্পদের পাহাড়, বিদেশে অর্থ পাচারের শঙ্কা  : অভিযোগে আরও বলা হয়, রেলওয়ে কোয়ার্টারে বসবাস করলেও তার নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে ফ্ল্যাট, স্ত্রী নাজনীন/নাসরিন হোসেনের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা জমি, পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের লেনদেন এবং বেনামী সম্পদের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেন, ২০৩১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার আগেই বিদেশে অর্থ পাচারের চেষ্টা করছেন এই কর্মকর্তা।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি : এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ও প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পটভূমি : ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল দেখা দেওয়ার পর ট্রেন চলাচলের গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। এতে সময় অপচয়, শিডিউল বিপর্যয় এবং যাত্রী ভোগান্তি বাড়তে থাকে।

এ পরিস্থিতিতে যমুনা নদীর ওপর আলাদা রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। প্রায় ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির বড় অংশের অর্থায়ন করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু” নামে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

জাপানের আইএইচআই, এসএমসিসি, ওবায়শি কর্পোরেশন, জেএফই এবং টিওএ কর্পোরেশন যৌথভাবে তিনটি প্যাকেজে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেতুটির নাম পরিবর্তন করে “যমুনা রেলওয়ে সেতু” রাখা হয়। তবে উদ্বোধনের পর থেকেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল এই প্রকল্প এখন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও জবাবদিহিহীনতার অভিযোগে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

👁️ 76 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *