
নইন আবু নাঈম তালুকদার (শরণখোলা) : দেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা শরণখোলা। নদী, সাগর ও বনবেষ্ঠিত এ জনপদ একসময় বলেশ্বর নদীর সুস্বাদু ইলিশের জন্য সুপরিচিত ছিলো। নব্বইয়ের দশকে আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই এখানকার মানুষ বলেশ্বর নদীর ইলিশ হালি হিসেবে কিনে কলাপাতার রশিতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতেন।

তখন এক হালি বড় ইলিশের দাম ছিল মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা,যা ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। সে সময় অধিকাংশ বাড়িতে ফ্রিজ না থাকায় অনেক পরিবার অতিরিক্ত ইলিশ কিনে লবণ দিয়ে টিনের পাত্রে সংরক্ষণ করত। এমনও সময় ছিল প্রতিদিন ইলিশ খেতে খেতে অনেকের অনাগ্রহ তৈরি হতো। কিন্তু সময় বদলেছে।
এখন সেই ইলিশ যেনো সাধারণ মানুষের থালা থেকে হারিয়ে গেছে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকার নদী ও সাগরে মাছ ধরায় কয়েক দফার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি। কিন্তু এতসব উদ্যোগের পরও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ মিলছেনা। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-কোথায় গেলো সেই ইলিশ?

রায়েন্দা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকার জেলে মনির হোসেন বলেন, একসময় বলেশ্বর নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়তো। তখন হালি হিসেবে বিক্রি হতো। এখন আর নদীতে সেই ইলিশ নাই। সরকার নদী ও সাগরে ৫৮ এবং ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয়, যাতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এতোকিছুর পরেও নদীতে ইলিশ বাড়ছে না। নদীতে জাল ফেলে মাছ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। দু-একটি ছোটো ইলিশ মিললেও বড় ইলিশ প্রায় পাওয়াই যায়না।

বাজারে কথা হয় স্থানীয় গৃহিণী শাকিলা সুলতানা অথিয়ার সাথে। তিনি বলেন, বাজারে ইলিশ খুব কম পাওয়া যায়। যাও পাওয়া যায় তার দাম অনেক বেশি। আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে কিনে খাওয়া সম্ভব না।
একই বাজারের ওয়ার্কসপ ইঞ্জিনিয়ার মো: টিটু হাওলাদার বলেন,বর্তমানে মানুষের আয়-রোজগার একেবারে কম। বেশিরভাগ মানুষই দেনাগ্রস্থ। এতো দাম দিয়ে ইলিশ কেনা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না।
স্থানীয়দের মতে, নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বছরে একবার কোরবানি ঈদে গরুর গোসত খেতে পারলেও এই দামে ইলিশ কিনে পরিবার নিয়ে খেতে পারেন না। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, এখন মধ্যবিত্তদের কাছেও বলেশ্বরের রুপালি ইলিশ বিলাসিতায় পরিনত হয়েছে।
বাজারে পাওয়া সবচেয়ে ছোট জাটকা ইলিশের কেজি বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১২’শ টাকা। সাইজে একটু বড় হলে তার দাম বেড়ে দাঁড়ায় তিন থেকে চার হাজার টাকা।
রায়েন্দা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন জানান, বর্তমানে সাগরে ও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ খুবই কম। যাও পাওয়া যায় তার দাম অনেক বেশি। জেলেরা দু-একটি বড় ইলিশ পেলেও তা বিক্রি করেন তিন থেকে চার হাজার টাকায়। যা সাধারণ মানুষ কিনে খেতে পারেনা।
একই বাজারের ব্যবসায়ী সোহাগ বলেন,মানুষের ইলিশের প্রতি আলাদা ভালবাসা আছে। তাই দাম যতই হোক কষ্ট করে হলেও কিনে খায়। তবে,বেশিরভাগই সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা আসেন ইলিশ কিনতে।
শরণখোলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো: আবুল হোসেন জানান,নদী ও সাগরে আগের মতই ইলিশ আছে। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু জেলেরা অবৈধ চরগড়া ও বেন্দিজাল পেতে শতশত টন ইলিশের বাচ্চা মেরে ফেলে। এছাড়াও ইলিশ ধরার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতে আধুনিক সব পদ্ধতি ব্যবহার করায় মাছ কমে যাচ্ছে,পাশাপাশি দুর্যোগ তো আছেই।
তবে,ইলিশ মৌসুম ও মাছ কম হওয়া নিয়ে ভিন্ন কথা বলছেন, শরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস। তিনি বলেন,সাগর-নদীতে ইলিশ ঠিকই আছে, সাধারণত সেই ইলিশের মৌসুম শুরু হয় বছরের ভাদ্র-আশ্বিন মাসে। এর মাঝে অনেকের জালেই কম বেশি মাছ ধরা পড়ে। মাছ কম থাকলে দাম একটু বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
