
সাধন সাহা জয়, (ব্রাহ্মণবাড়িয়) : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরাসার এলাকার একটি ভাড়া বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া পারভীন আক্তার (৫৫) নামে এক নারীর গলিত মরদেহ গ্রহণ করেননি তার সন্তান ও স্বজনরা। অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মায়ের শেষ বিদায়ের দায়িত্ব নিল সামাজিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’।

সংগঠনের উদ্যোগে গতকাল শনিবার বিকেলে পৌর এলাকার পূর্ব মেড্ডার তিতাস নদীসংলগ্ন বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে। নিহত পারভীন আক্তার কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার প্রয়াত রেজ্জাক মিয়ার মেয়ে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩৫ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকার বাসিন্দা বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে পারভীন আক্তারের বিয়ে হয়েছিল। পরে প্রথম স্বামীকে তালাক দিয়ে তিনি জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর এলাকার ইসহাক মৃধাকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্বামী ইসহাক মিয়াও ইতিমধ্যে মারা গেছেন।

গত বৃহস্পতিবার (ঈদের দিন) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের বিরাসার গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে পারভীন আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন ঘরের ভেতরে পড়ে থাকায় মরদেহটিতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বাড়ির মালিককে জানালে তিনি পুলিশে খবর দেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালের মর্গে লাশ পড়ে থাকলেও পারভীন আক্তারের প্রথম পক্ষের দুই মেয়ে রত্মা বেগম ও ফাতেমা, বড় মেয়ের জামাতা কবির মিয়া কিংবা সাবেক স্বামী বাচ্চু মিয়ার কেউ-ই মরদেহ নিতে রাজি হননি। মরদেহ অতিরিক্ত পচে যাওয়া, শরীরে পোকা ধরা এবং তীব্র দুর্গন্ধের অজুহাতে তারা লাশ গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে উপায় না দেখে গত শুক্রবার পারভীন আক্তারের তালাকপ্রাপ্ত স্বামী বাচ্চু মিয়া মরদেহ দাফনের জন্য ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ সংগঠনের কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহটি সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. আজহার উদ্দিন জানান, “আমরা পরিবারের কাছে মরদেহটি হস্তান্তরের সব ধরনের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সন্তানদের এমন নির্মম আচরণে আমরা স্তব্ধ। পচন ও দুর্গন্ধের কারণে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের লাশ সন্তানরা ফেলে চলে গেছে।
পরবর্তীতে মানবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের সংগঠনের সদস্যরা শনিবার বিকেলে ধর্মীয় নিয়ম মেনে জানাজা শেষে পূর্ব মেড্ডার তিতাস নদীর তীরের বেওয়ারিশ কবরস্থানে উনাকে দাফন সম্পন্ন করে।”
এ ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিজের গর্ভধারিণী মায়ের শেষ বিদায়ে সন্তানদের এমন বিমুখতা মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
