
নিজস্ব প্রতিনিধি (বেনাপোল) : আল আরাফা সিকিউরিটি গার্ড কোম্পানির নাম ব্যবহার করে চাকরির প্রলোভনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি এখন এক জটিল মোড় নিয়েছে। প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত তারক দাস ও ফরিদা খাতুনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য। একদিকে ভুক্তভোগীদের আহাজারি, অন্যদিকে অভিযুক্তদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং স্থানীয় সালিশের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

অভিযুক্তদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দায় এড়ানোর চেষ্টা :
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত তারক দাস নিজেকে শুধুমাত্র ‘মাধ্যম’ হিসেবে দাবি করে পুরো দায় ফরিদা খাতুনের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। বিপরীতে, ফরিদা খাতুনের দাবি, তারা উভয়ে মিলেই টাকা গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে কোম্পানি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে—এই অজুহাতে ফরিদা আর্থিক সংকটের কথা বলে দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, মানুষের কষ্টার্জিত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঠিক কোথায় গেল এবং কারা ভোগ করল?
গ্রাম্য সালিশ ও সাংবাদিকের ভূমিকা : উক্ত অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় এর আগে একটি গ্রাম্য সালিশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে তারক দাস লিখিতভাবে টাকা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে স্বাক্ষর করেছিলেন। এই সালিশের ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিক মিলন হোসেন ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি আব্দুল জলিল ও হালিম হক্কানীর উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সাংবাদিক মিলন হোসেন জানান, “আমি অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি। তারক দাস সবার সামনে নিজের মুখে অপরাধ স্বীকার করেছে। সেখানে কোনো জোরজবরদস্তির ঘটনা ঘটেনি।” তবুও, সালিশি সিদ্ধান্তের পর তারক দাস এখন পাল্টা দাবি করছেন যে, তাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয়েছিল।

প্রশাসনিক আশ্রয়ের রহস্য ও প্রতারকের কৌশল : সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত তারক দাস এখন প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—একটি কোম্পানির নাম ব্যবহার করে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের আশ্রয় পেতে পারেন?
এটি কি তাদের প্রতারণারই নতুন কোনো কৌশল? প্রশাসনিকভাবে তারক দাস কোনো অভিযোগ বা নথিপত্র দাখিল করেছেন কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।
ফ্রিজ নিয়ে ফরিদা খাতুনের পাল্টা অভিযোগ ও সত্যতা
ফরিদা খাতুন আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, তার বাসা থেকে ৩২ হাজার টাকা মূল্যের একটি ফ্রিজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নাকচ করে দিয়েছেন ভুক্তভোগী ও পাওনাদার আবু বক্কর।
তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ফরিদা খাতুনের বাসা থেকে কোনো ফ্রিজ আনা হয়নি। অন্য কোনো পাওনাদার হয়তো তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই ফ্রিজটি নিয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু আমার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”
প্রতারণার নেপথ্যে সরকারি কর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহার
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে তারক দাস—যিনি বেনাপোল স্থলবন্দরে একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কর্মরত—তিনি তার ব্যক্তিগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছেন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ফরিদা খাতুন।
এই চক্রটি বেনাপোল স্থলবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। একজন RADISSON DIGITAL TECHNOLOGIES LTD.পরিচ্ছন্নতা কর্মী হয়ে রাষ্ট্রের নাম ভাঙিয়ে এই ধরনের দুর্নীতি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রশাসনের প্রতি ভুক্তভোগীদের সুস্পষ্ট দাবি ও করণীয় :
ভুক্তভোগীরা এখন প্রশাসনের কাছে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন:
১. তদন্তের পরিধি বৃদ্ধি: শুধু তারক দাস ও ফরিদা খাতুনই নয়, এই প্রতারক চক্রের সাথে আর কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে একটি নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।
২. ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অডিট: অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত, যৌথ এবং সকল মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে জব্দ করার দাবি তোলা হয়েছে। তারা এ যাবতকাল কত টাকা লেনদেন করেছেন, তা অডিট করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৩. সম্পত্তির অনুসন্ধান: প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে অভিযুক্তরা কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
৪. আইনি ব্যবস্থা: তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া মাত্রই দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশাসনের প্রতি চরম সতর্কবার্তা : স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এই ধরনের জালিয়াতি রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য কাম্য নয়। যদি কোনো পর্যায় থেকে এই প্রতারক চক্রকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়, তবে ভুক্তভোগীরা বাধ্য হয়ে বিষয়টি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নজরে আনবেন।
হাতে লেখা নথিতে আর্থিক হিসাবের প্রমাণ : ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে প্রাপ্ত নথিপত্রে প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে:
হিসাব বিবরণী (নীল কাগজ)৯জন ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত ৬৫,৫০০ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে। তালিকাটি ‘তারক দাদা’ এবং ‘ফরিদা খাতুন/মিজান’-এর নামে সংরক্ষিত।
লিখিত অঙ্গীকারনামা (সাদা কাগজ): তারক দাস কর্তৃক মো: আবু বক্কর থেকে ৬০,০০০ টাকা গ্রহণের লিখিত স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা ৬ মে ২০২৬ তারিখে নেওয়া হয়।
সর্বশেষ পরিস্থিতি : যদিও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসছে, তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া মাত্রই এ বিষয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
