ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্প থেকে এলটিএম টেন্ডার পর্যন্ত : নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুসাকে ঘিরে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

# ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে জালিয়াতি # টেন্ডার কারসাজি # বেনামি ঠিকাদারি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ # নীরব নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মুসা নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের নরসিংদী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মুসাকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি এবং শত শত কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট প্রস্তুত, এলটিএম টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও মেরামত কাজকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্ব পালন করে আসা এএসএম মুসা ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প-কারখানা, দোকান, মার্কেট, বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) প্রতিবেদনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট তৈরির কাজে অধীনস্থ উপসহকারী প্রকৌশলী ইকরামুল হাসান ও আনোয়ারুল হককে ব্যবহার করে কয়েকশ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা অনুকূল রিপোর্ট প্রদানের আশ্বাসে সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় উপসহকারী প্রকৌশলী ইকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে প্রথমে ভোলা এবং পরে পিরোজপুরে বদলি করা হলেও অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মুসা এখনও বহাল রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে তিনি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো গণপূর্ত বিভাগে পদায়নের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ : নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে এলটিএম (Limited Tendering Method) পদ্ধতিকে ব্যবহার করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এএসএম মুসার বিরুদ্ধে।

ই-জিপি সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একাধিক এলটিএম টেন্ডারে অস্বাভাবিকভাবে মাত্র এক, দুই অথবা তিনটি করে সিডিউল বিক্রি, রেসপন্স ও মূল্যায়ন দেখানো হয়েছে।

১১২৫৬০৬, ১১২২৫৩৮, ১১২৫২১১, ১১২২৩০০, ১০৫০৪১৪, ১১১৭৯২৩ এবং ১১২২৩১৭ নম্বর টেন্ডার আইডিতে মাত্র তিনটি করে সিডিউল বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে ১০৭০০৬৫, ১০৬২৩৩৯, ১১২৫৫৯৩, ১১২৫৬০৭, ১১২৬০১৬ এবং ১০৮১৩৬৮ নম্বর আইডিতে মাত্র দুটি করে সিডিউল বিক্রি ও মূল্যায়ন দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে ১০৬২৩৫৯, ১০৬৮১২৮, ১০৯৩৮৬৬, ১১১৭৯২৩, ১০৭৪৮৭৭, ১০৮১০৫২ এবং ১১২১৪১৪ নম্বর টেন্ডারে মাত্র একটি করে সিডিউল বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে এসব টেন্ডারে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫টিরও বেশি সিডিউল বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু সীমিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতা সংকুচিত করা হয়েছে।

জরুরি মেরামত প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ : জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত নরসিংদী জেলা কারাগার, জেলা জজ আদালত এবং অন্যান্য সরকারি স্থাপনার জরুরি মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সূত্রগুলোর দাবি, প্রথমে পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ সম্পন্ন করিয়ে পরে ওটিএম (Open Tendering Method) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ বৈধতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।

হাসপাতাল প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ : ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেন প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের প্রধান ফটক, বাউন্ডারি ওয়াল এবং অভ্যন্তরীণ আরসিসি সড়ক নির্মাণ কাজেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অধীনস্থ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে কার্যত নিজেই ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ আত্মসাত করা হয়েছে।

ভোলা অধ্যায়ের বিতর্ক  : এএসএম মুসা এর আগে ভোলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং টেন্ডার কারসাজির অভিযোগে আলোচনায় আসেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সে সময় তিনি ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে একাধিক কাজ পাইয়ে দেন। এর মধ্যে ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার এবং মেসার্স রাতুল এন্টারপ্রাইজের নামও উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট বিভাগে তালিকাভুক্ত না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন এলটিএম টেন্ডারে অংশগ্রহণ ও কাজ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তখন স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

সহযোগীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ : নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ারুল হক এবং মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম, বেনামি ঠিকাদারি ব্যবসা এবং পার্সেন্টেজ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষ্য, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটির বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যার ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা ব্যাহত হচ্ছে।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি : এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মুসার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় ঠিকাদার, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সচেতন মহল।

👁️ 40 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *