
বিশেষ প্রতিবেদক : দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। সেতু, সড়ক, ভবন, খাল খনন, নদী শাসন থেকে শুরু করে সরকারি ক্রয়ের প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। কিন্তু সেই অর্থের কতটা জনগণের কল্যাণে গেছে আর কতটা গেছে ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে—সেই প্রশ্ন এখনো তাড়া করে ফিরছে দেশবাসীকে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শক্তিশালী একটি প্রভাবশালী বলয়—এমন অভিযোগ বহুদিনের। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে টেন্ডার কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ ওঠে বারবার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার সুযোগ না পেলেও ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে কাজ পেয়েছে। ফলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা কমেছে, বেড়েছে ব্যয় এবং প্রশ্নের মুখে পড়েছে স্বচ্ছতা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সংসদীয় আলোচনার ভিডিও নতুন করে সেই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। সেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং তা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ভিডিওটি প্রকাশের পর জনমনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কি সত্যিই সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়েছিল, নাকি পুরো ব্যবস্থাই ছিল একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে?

বিশ্লেষকদের মতে, টেন্ডার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতাকেও দুর্বল করেছে। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ, সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়া এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা একটি বড় কারণ হিসেবে বহুবার আলোচনায় এসেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের বিতর্কিত টেন্ডার, বড় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হলে বহু অজানা তথ্য সামনে আসতে পারে।
দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা মনে করেন, শুধু নতুন নিয়ম করলেই হবে না; বরং অতীতের অনিয়মের দায় নিরূপণ, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সরকারি ক্রয়ের প্রতিটি ধাপ জনসম্মুখে উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় সরকারের পরিবর্তন হলেও টেন্ডার সিন্ডিকেটের সংস্কৃতি থেকে যাবে আগের মতোই।
রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের সম্পদ। সেই সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অন্যতম শর্ত। তাই অতীতের অভিযোগ, বর্তমানের সংস্কার এবং ভবিষ্যতের স্বচ্ছতার প্রশ্নে এখন দেশের নজর সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থার দিকে।
