শেয়ার, শতকোটি টাকা, দুদকের অনুসন্ধান ও মানিলন্ডারিং অভিযোগে ঘেরা বাংলা টিভি : সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগের জাল, বিচারিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায় বহু প্রশ্ন !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত কর্পোরেট সংবাদ জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদকব :  বাংলাদেশের বেসরকারি গণমাধ্যম খাতে একসময় সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলোচিত বাংলা টিভি এখন ঘিরে রয়েছে শেয়ার জটিলতা, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এবং মানিলন্ডারিং মামলাসহ নানা বিতর্কে।


বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অভিযোগ নতুন করে করপোরেট সুশাসন ও গণমাধ্যম খাতের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও অভিযোগগুলোর অনেকগুলোই এখনো তদন্তাধীন কিংবা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগপত্র, আদালতের তথ্য ও দুদকের অনুসন্ধান এক জটিল চিত্র সামনে এনেছে।

শেয়ার হস্তান্তরকে ঘিরে ২৮ কোটি টাকার বিতর্ক  : বাংলা টিভির মালিকানা ও শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সৈয়দ সামাদুল হক। অভিযোগকারী কয়েকজন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীর দাবি, শেয়ার হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তাদের নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের মালিকানাধীন ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান তিনি।


বিজ্ঞাপন

এ প্রক্রিয়ায় কে এম আকতারুজ্জামান, মো. মনিরুল ইসলাম এবং কে এম রিফাতউজ্জামানের নাম উঠে আসে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শেয়ার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মালিকানার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয় এবং এ লক্ষ্যে প্রায় ২৮ কোটি টাকা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অর্থ গ্রহণের পরও শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি এবং অর্থ ফেরতও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়েও পৌঁছায় অভিযোগ : শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বিভিন্ন আবেদনেও বাংলা টিভির শেয়ার হস্তান্তর জটিলতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ঝুলে থাকায় বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৮ বছরেও মেলেনি শেয়ার ? বাংলা টিভির শেয়ার নিয়ে অতীতেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করেন। এ তালিকায় দিনাজপুর-৩ আসনের বিএনপি নেতা, শিল্পপতি ও সমাজসেবক আলহাজ হাফিজুর রহমান সরকারের নামও আলোচনায় আসে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৮ বছর আগে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলেও এখনো তাঁর নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বিনিয়োগের অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।

দুদকের নজরে বাংলা টিভি : বিভিন্ন অভিযোগ একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে আসে। দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ মে শেয়ার কেনাবেচার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বক্তব্য গ্রহণের জন্য সৈয়দ সামাদুল হককে তলব করা হয়।

দুদকের স্মারকে বলা হয়, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁর বক্তব্য প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী তাঁকে কমিশনের কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল।

সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ে বিশেষ অনুসন্ধান : ২০২৪ সালে দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখা তাঁর দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাঁর আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদের উৎস এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং আর্থিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনা শুরু করেন।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও মানিলন্ডারিং মামলা : ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুদক সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের তথ্য প্রকাশ করে। দুদকের দাবি অনুযায়ী, অনুসন্ধানে তাঁর নামে ৪ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।

একই সঙ্গে কয়েক কোটি টাকার অর্থ বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তর বা বৈধ হিসেবে প্রদর্শনের চেষ্টার অভিযোগও আনা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ এবং বৈধ আয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান পাওয়া গেছে। সংস্থাটির দাবি, ঘোষিত আয়ের মাধ্যমে সম্পদের পুরো অংশের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

আয়কর নথি জব্দের অনুমতি : ২০২৬ সালে আদালতের মাধ্যমে তাঁর আয়কর নথি জব্দের অনুমতিও নেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে বলা হয়, সম্পদ ও আয়ের প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের জন্য একাধিক বছরের আয়কর রিটার্ন এবং সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

সিদ্ধেশ্বরীর ভবন নিয়ে বিরোধ  : বাংলা টিভির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর একটি ভবন নিয়েও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়া হিসেবে করা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবন ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভাড়া বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া রয়েছে।

বেতন-ভাতা ও আর্থিক সংকটের অভিযোগ : বাংলা টিভির কিছু বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকা, আর্থিক সংকটের অজুহাতে নিয়মিত পরিশোধ না করা এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিনিধি নিয়োগেও বিতর্ক : প্রতিনিধি নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

থানার মামলাও আলোচনায় : উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া দুটি মামলার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মামলাগুলোয় বিভিন্ন দণ্ডবিধির ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

যা বলছেন সৈয়দ সামাদুল হক : অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হক এসব অভিযোগের বিষয়ে বরাবরই ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। অতীতে দুদকের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি নিজেকে একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা বলেন। তাঁর দাবি, বাংলা টিভির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। শেয়ার হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের পেছনে ব্যবসায়িক মতবিরোধ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। অতীতে তিনি বিভিন্ন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও আবেদন করেছেন।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রায় নয়  : বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা টিভিকে ঘিরে শেয়ার মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবির বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়নের জন্য কোম্পানির শেয়ার রেজিস্টার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপত্র, কর নথি এবং আদালতের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। বর্তমানে অধিকাংশ বিষয়ই অভিযোগ, অনুসন্ধান বা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত রায় এবং তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কোনো পক্ষকে দায়ী কিংবা নির্দোষ ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

বাংলা টিভিকে কেন্দ্র করে চলমান এই বিরোধ বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে করপোরেট সুশাসন, মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

👁️ 59 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *