
নিজস্ব প্রতিবেদক : “গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের ফার্সির দাবীতে চট্টগ্রাম শ্রমিক সমাবেশ” শিরোনামে এই নিউজটা ছাপা হয়েছিল ২০২০ সালের ২৩ আগষ্ট দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিন পত্রিকায়। অবশ্য এই শিরোনামে শুধু এই পত্রিকায় নয়, এই জাতীয় শিরোনামে সেই সময়ে অসংখ্য পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল সেই সমাবেশকে ঘিরে ।

তৎকালীন সময়ে সিইপিজেড থানা হকার্স শ্রমিক সিবিএ / নন সিবিএ বেসিক সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে সেই সমাবেশের সভাপতিত্ব করেছিল নিষিদ্ব সংগঠন চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় শ্রমিক লীগ নেতা ও যমুনা অয়েল কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব। সেই সমাবেশে তিনি জোরালো কন্ঠে অনেকটা উচ্চ স্বরে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার ফাসিঁ দাবি করেছিল ।
কিন্তু ভাবা যায় সেই এয়াকুবের নিয়ন্ত্রণে এখনো যমুনা অয়েল কোম্পানি পিএলসি । জুলাই গন আন্দোলনের একাধিক হত্যা প্রচেষ্টার মামলার এজাহারভুক্ত আসামি জাতীয় শ্রমিকলীগের এই নেতা । গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ দিন জেল হাজতে ছিলেন, হয়েছেন চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত । এরপরেও তারই নিয়ন্ত্রণে যমুনা অয়েল কোম্পানি পিএলসি ।

শোনা যাচ্ছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে যেকোনো সময় তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হয়ে যেতে পারে। বরখাস্ত হয়েও প্রতিনিয়ত সে মহরা দেয় যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে। জানা গেছে ইতিমধ্যে সে বিভিন্ন ডিপোর ডিএসদের বার্তা দিয়েছে শ্রীঘ্রই তার সাসপেন্ড প্রত্যাহার করা হবে । তার ভয়ে তটস্থ খোদ যমুনা অয়েলের সিবিএর বিএনপিপন্থী নেতৃবৃন্দও।

সম্প্রতি যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের এই সিবিএ নেতার একটি অডিও ক্লিপ আমাদের দপ্তরে এসেছে। এই অডিও ক্লিপে নিজেকে মদখোর এবং নারী নেশায় আসক্ত বলে নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি ।

তাছাড়া যমুনা অয়েলে তার একক আধিপত্য ও বিভিন্ন অনিয়মের কথা ফুটে উঠেছে আলোচিত এই অডিও ক্লিপে। এক কান দুই কান হয়ে মুহাম্মদ এয়াকুবের কান পর্যন্ত পৌঁছে তার অডিও ক্লিপের খবরটি । এমনকি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগে এই অডিও ক্লিপটি ছড়িয়েও গেছে । তারই ধারাবাহিকতায় এই সিবিএ নেতা তার ফেইসবুক আইডিতে একটি পোষ্ট আপলোড দিয়েছেন, যেখানে মুহাম্মদ এয়াকুব বলেছেন ” আমার বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, যারা আমার নীরবতাকে দুর্বলতা মনে করছেন, তারাই ভুল করেছেন” ।
সত্যিকার অর্থেই এই সিবিএ নেতা যমুনা অয়েলে অনেক সুপার পাওয়ার ফুল। সাময়িক ভাবে চাকরী থেকে বরখাস্ত কৃত হলেও বর্তমান সময়েও তারই ইশারাই চলছে যমুনা অয়েলের প্রশাসনিকের অধিকাংশ কার্যক্রম। জানা গেছে এই সিবিএ নেতার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রনেই চলছে সবকটি ডিপোর তেল চুরির সিন্ডিকেট।
এদিকে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিপিসি সচিব শাহীনা সুলতানা স্বাক্ষরিত সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন আজাদ মহাব্যবস্থাপক ( অর্থ) এবং সদস্য সচিব মিজানুর রহমানকে ( মহাব্যবস্থাপক বানিজ্য অপারেশন) ।
গত বছরের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য লিখিত ভাবে তদন্ত কমিটিকে বলা হয়েছে । কিন্তু অদ্যবধি তদন্ত কমিটি জমা দেয়াতো দুরে থাক, তদন্তের কার্যক্রমই শুরু করেনি। দ্বিতীয় দফা বিপিসি সচিব শাহীনা সুলতানা স্বাক্ষরিত আরেকটি অফিস আদেশ দিয়েছে তদন্ত কমিটিকে।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার অফিস আদেশে বলা হয়েছে আগামী দশ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য । এই চিঠির মেয়াদও অনেক আগেই পার হয়ে গেছে কিন্তু এবারও তদন্ত কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়নি । অভিযোগ উঠেছে তদন্ত কারী দুই কর্মকর্তাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রেখেছে মুহাম্মদ এয়াকুব। তদন্তকারী দুই কর্মকর্তাকে নুন্যতম দশ বার ফোন দেয়া হয় , কিন্তু দুজনের কেউ ফোন রিসিভ করেনি ।
এদিকে সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহারের যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষকে অব্যাহত চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্বে। অবশ্য তার হয়ে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই কাজ করছে একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। জানা গেছে গত দুই মাস আগে চট্টগ্রাম সিটিকর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও নিষিদ্ধ সংগঠন মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজম নাসিরের বড় ভাই একেএম সাইফুদ্দিন দলবল নিয়ে হাজির হয় যমুনা অয়েলের এমডির দপ্তরে। এই আওয়ামীলীগ নেতার ভাইয়ের সাথে ছিলেন যমুনা অয়েলের বিতর্কিত কর্মকর্তা সম্প্রতি ওএসডি হওয়া মাসুদুল ইসলামও ।
সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের ওস্তাদ খ্যাত ক্ষমতাধর এই মাসুদুল ইসলামের আমন্ত্রণেই আজম নাসিরের সহোদর যমুনা অয়েলে এসেছিল । যদিও সাইফুদ্দিন একসময় যমুনা অয়েলের কেরানি ছিলেন, পরবর্তীতে ছোট ভাই আজম নাসিরের ক্ষমতার দাফটে হয়েছিল ডিজিএম। বিভিন্ন সুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে বহিস্কৃত সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের চাকরি ফেরতের সুপারিশে এসেছিলেন এই আওয়ামিলীগ নেতার সহোদর৷
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রয়ারী যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম এইচ আর মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরে তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় । তিন সিবিএ নেতাদের একজন মুহাম্মদ এয়াকুব । এই সিবিএ নেতার বরখাস্তের চিঠিতে বলা হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১২ জানুয়ারী ২০২৬ পর্যন্ত ছুটি ভোগ করেছে, এর পর অনুপস্থিত।
প্রাপ্ত তথ্যমতে চান্দাগাও থামায় একটি মামলায় তাকে ১৩ ডিসেম্বর গ্রেফতার হয়ে, ১৪ ডিসেম্বরে আদালতের মাধ্যমে জেল খানায় প্রেরন করেছে ৷ এমতবস্থায় তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয় । মজার বিষয় হলো এই সিবিএ নেতা যেদিন গ্রেফতার হলেন, এর পরের দিন থেকেই ছুটি মন্জুর হলো কিভাবে? তাছাড়া পুলিশ হেফাজতে থেকে তারা ছুটির আবেদনই বা করলো কিভাবে? অভিযোগ উঠেছে মাসুদুল ইসলাম নিজেই এয়াকুবের স্বাক্ষর দিয়ে ছুটির আবেদন করে এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই তা মন্জুর করেন।
যদিও এই সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে একটি, বাস্তবে এর বিরুদ্ধে মামলা আছে নুন্যতম চারটি।
এদিকে ইতিমধ্যে তিনি জেল হাজত থেকে জামিনে বের হন । এরপরই শুরু হয়েছে এই সিবিএ নেতার ফের দৌড়াত্ম । বিশেষ করে ১৬ মার্চ জেল হাজত থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তার দৌরাত্ম্য অনেকটা বেড়ে গেছে ।
অভিযোগ উঠেছে নিজের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহারের জন্য যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে । তার চাপে সেই অনুযায়ী কাজ করার অভিযোগ উঠেছে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে । ২৩ মার্চ যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবর সাময়িক বরখাস্তের প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করে এই সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব৷ এর প্রেক্ষিতে ২৯ মার্চ হাসান ইমাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এয়াকুবকে তার বিরুদ্ধে যেসকল অভিযোগ তোলা হয়েছে তা জবাব দিতে বলা হয়েছে আগামী দশ কার্য দিবসের মধ্যে। তিনি জবাবও দিয়েছেন।
তারই ধারাবাহিকতায় যে কোনো সময় প্রত্যাহার হতে পারে তার সাময়িক বরখাস্ত। যার নামে জুলাই গণআন্দোলনের হত্যা প্রচেষ্টার একাধিক মামলা আছে, তার সাসপেন্ড প্রত্যাহার হয় কিভাবে? এরকম প্রশ্ন তুলেছে যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা । তিনি চাকরি ফিরে পেলো আবারও বিগত সতের বছরের মতো লুটেপুটে খাবে যমুনা অয়েল। নেতৃত্ব দিবে তেল চুরির সিন্ডিকেট । এবিষয়ে এয়াকুবের সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করা হয়, ফোন দেয়া হয় একাধিকবার, কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
