
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রতিটি উপজেলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কার্যক্রম সম্প্রসারণের বহু প্রতীক্ষিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছে।

প্রায় চার দশক পর ৪৯৫টি উপজেলায় গণপূর্তের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অধিদপ্তরের পাঠানো সাংগঠনিক কাঠামোর প্রস্তাব একাধিক অসংগতি, তথ্যের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ফেরত পাঠিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
শুধু তাই নয়, পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ছাড়া প্রস্তাবটি এগোবে না জানিয়ে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই গত এপ্রিল মাসে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

প্রস্তাবে নতুন কোনো পদ সৃষ্টি না করে বিদ্যমান জনবল থেকেই ৪৮৫ জন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং সমসংখ্যক অফিস সহকারী নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে আলোচনার পর প্রস্তাবটিকে অসম্পূর্ণ ও পর্যাপ্ত তথ্যবিহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সেটি অধিকতর পর্যালোচনার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরে ফেরত পাঠানো হয় এবং প্রাক-নিকার শাখায় উপস্থাপনের আগে পূর্ণাঙ্গ ও সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়।
মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা প্রশ্নে আটকে গেল পরিকল্পনা : মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উপজেলা পর্যায়ে নতুন অফিস স্থাপনের যৌক্তিকতা বাস্তব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত সাংগঠনিক কাঠামোতে বিদ্যমান, নতুন, অস্থায়ী এবং বিলুপ্ত পদ আলাদা রঙে চিহ্নিত করে অর্গানোগ্রাম জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রি-চার্ট, প্রতিটি কার্যালয়ের জনবল, যানবাহন, যন্ত্রপাতির তালিকা, রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬ অনুযায়ী আইনি ভিত্তি, নিয়োগ বিধিমালার সামঞ্জস্য, নতুন বিধিমালার প্রয়োজনীয়তা, আর্থিক ব্যয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং তিন, ছয় ও নয় বছর মেয়াদি বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানতে চেয়েছে, জেলা পর্যায়ে নতুন প্রশাসনিক ইউনিট না গড়ে বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব কি না।
‘একজন উপসহকারী প্রকৌশলী দিয়ে একটি উপজেলা চালানো অবাস্তব’ : প্রস্তাবিত কাঠামোর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো প্রতিটি উপজেলায় মাত্র একজন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক কাম হিসাব সহকারীর পদ রাখা।
মাঠপর্যায়ের একাধিক প্রকৌশলী বলছেন, একটি উপজেলার নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকল্প তদারকি, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কারিগরি দায়িত্ব একজন কর্মকর্তার পক্ষে বহন করা বাস্তবসম্মত নয়।
তাদের মতে, জেলা পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সঙ্গে সমন্বয় করেন। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে একই ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয় করতে হলে পদমর্যাদা ও দায়িত্বের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
এ কারণে প্রকৌশলীদের বড় একটি অংশের প্রস্তাব, প্রতিটি উপজেলায় পৃথক অফিস না করে দুই বা তিনটি উপজেলা নিয়ে একটি উপবিভাগ গঠন করা হোক এবং তার নেতৃত্বে থাকুন একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই)।
আসছে নতুন মডেল : সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ও মাঠপর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে এখন নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে।
নতুন প্রস্তাবে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর নেতৃত্বে সিভিল এবং ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টিম গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই টিম একাধিক উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্প ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কর্মকর্তাদের মতে, এতে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড অক্ষুণ্ন থাকবে, জবাবদিহিতা বাড়বে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মানও উন্নত হবে।
চার দশকের পুরোনো কাঠামোয় চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ১৯৮৪ সালের এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গঠিত রি-অর্গানাইজেশন সেটআপের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ, মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, উপজেলা ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি), মডেল মসজিদসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
ফলে জেলা সদর থেকে দূরবর্তী উপজেলায় এসব প্রকল্পের কার্যকর তদারকি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
‘লোক দেখানো সম্প্রসারণ নয়, চাই কার্যকর কাঠামো’ : পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সরকার বলেন, উপজেলা পর্যায়ে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ সেটআপ গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রশাসনিক সমন্বয়, জবাবদিহিতা, চেইন অব কমান্ড এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়।
সমিতির সভাপতি রায়হান মিয়া বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ গণপূর্ত অফিস প্রতিষ্ঠা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। সরকার দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করবে বলে তারা আশাবাদী।
দূরবর্তী প্রকল্প তদারকিতে বাড়ছে ব্যয় ও জটিলতা : গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বলেন বিপ্লব , বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ১০টি সিভিল জোন, ৩টি ই/এম জোন এবং সদর দপ্তরসহ মোট ১৪টি জোন রয়েছে। প্রতিটি জোনের অধীনে সার্কেল, বিভাগের অধীনে উপবিভাগ পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেলা সদর থেকে দূরবর্তী উপজেলার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করা সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে সম্ভব হয় না। এ কারণেই উপজেলা পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এখন যে সংশোধিত সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করবে উপজেলা পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বহু প্রতীক্ষিত সম্প্রসারণ বাস্তবেই কার্যকর হবে, নাকি এটি আরেকটি অসম্পূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যাবে।
