
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বর্তমান চেয়ারম্যান ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব রেজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, একচেটিয়া মাফিয়া সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং ধর্মীয় সংঘাত উসকে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক মহাপরিচালক (তদন্ত-১) থাকাকালীন বিতর্কিত ভূমিকা রাখা এই আমলা এবার টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সহিংসতার মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বিতর্কিত ও উগ্রপন্থী হিসেবে সমালোচিত দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারী বা “সাদপন্থীদের” স্বার্থ রক্ষায় নেপথ্য ভূমিকা রাখছেন বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। ওলামা-মাশায়েখ ও সাধারণ তৌহিদী জনতার একাংশের দাবি, এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক প্রশ্রয় ও প্রত্যক্ষ মদদেই ধর্মীয় অঙ্গনে এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
ইজতেমায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ট্রিপল মার্ডার : ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের নিয়ন্ত্রণ ও জোড় ইজতেমা আয়োজনকে কেন্দ্র করে তাবলিগ জামাতের মাওলানা জুবায়ের অনুসারী (শুরায়ে নেজাম) এবং দিল্লির মাওলানা সাদ অনুসারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৩টার দিকে এক পক্ষ ইজতেমা মাঠ দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে ভয়াবহ সংঘর্ষ বাঁধে। ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চালানো এই হামলায় কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়া (৭০), ঢাকার বেলাল হোসেন (৫৫) এবং বগুড়ার তাজুল ইসলামসহ (৬৫) মোট ৩ জন মুসল্লি নিহত হন এবং শতাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন।

মামলা দায়ের ও বিপিসি চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততা: এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জুবায়েরপন্থী শুরায়ে নেজামের সাথী এস এম আলম হোসেন বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকশত জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৪)।
মামলার নথিপত্র ও স্থানীয় ওলামা-মাশায়েখদের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার পেছনে গভীর নীল নকশা তৈরিতে এবং হামলাকারীদের প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও দেয়ালে ওলামা-মাশায়েখ ও সর্বস্তরের তৌহিদী জনতার ব্যানারে রেজানুর রহমানের ছবি সংবলিত পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। সেখানে এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাঁর ফাঁসি দাবি করা হয়েছে। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অভিযোগ, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে উসকানি দিয়ে পবিত্র ইজতেমা ময়দানকে রক্তরঞ্জিত করেছেন।
দীর্ঘ সময়েও থমকে আছে তদন্ত প্রক্রিয়া : লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ দিন পার হয়ে গেলেও মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া রহস্যজনকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ ৫ নম্বর আসামি মোয়াজ বিন নূরকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেও, প্রধান অভিযুক্ত ও নেপথ্য ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আলোচিত বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানসহ হেভিওয়েট আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার তদন্তকারী সংস্থা কোনো চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করতে পারেনি। মামলার বাদী পক্ষ ও স্থানীয় আলেমদের অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের অদৃশ্য ইশারায় মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তৌহিদী জনতার আলটিমেটাম : মামলার মন্থর গতি ও আসামিদের আড়াল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে গাজীপুর ও ঢাকার ওলামা-মাশায়েখরা নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাবলীগ জামায়াত সংশ্লিষ্টদের মূল দাবিগুলো হলো:
অবিলম্বে মামলার তদন্তভার কোনো নিরপেক্ষ ও দক্ষ সংস্থা (যেমন পিবিআই বা সিআইডি)-এর হাতে ন্যস্ত করতে হবে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী মো. রেজানুর রহমানকে বিপিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
পলাতক ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সকল আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
সচেতন মহল মনে করছেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই স্পর্শকাতর হত্যা মামলার মূল আসামিদের আইনের আওতাভুক্ত করা না হয়, তবে আগামী বিশ্ব ইজতেমার আগে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে আবারও বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
