
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ বিমানের কুয়েত স্টেশনে অতিরিক্ত (এক্সেস) ব্যাগেজ থেকে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগে করা তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তদন্তে অনিয়মের একাধিক তথ্য উঠে এলেও কৌশলে মূল দায়ীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং ‘তদন্তের সীমাবদ্ধতা’র কথা বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে স্টেশন ম্যানেজারকে রক্ষা করা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ ধরনের দায়সারা তদন্ত শুধু রাষ্ট্রীয় সংস্থার আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিকেই আড়াল করবে না, বরং বিদেশি স্টেশনগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সংস্কৃতিকেও আরও উৎসাহিত করবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিমানের যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ নিয়ে অভ্যন্তরীণ অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আকস্মিক তল্লাশি পরিচালনা করেন বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএম মেজর ফারহান তানভীর।

তল্লাশির দুই দিন পর তিনি বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে একটি প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কুয়েত থেকে আসা বিমানের বিজি-৩৪৪ ফ্লাইট ঢাকা অবতরণের পর বেল্টে থাকা ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ পরীক্ষা করা হয়।

তদন্তে দেখা যায়, তল্লাশিকৃত ১৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১২ জনই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ওজনের ব্যাগেজ বহন করেছেন। কিন্তু কুয়েত স্টেশনে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য প্রযোজ্য কোনো ফি আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, তল্লাশিকৃত কোনো যাত্রীর কাছেই অতিরিক্ত ওজনের বিপরীতে সরকারি ফি পরিশোধের কোনো রসিদ (রিসিট) পাওয়া যায়নি।
বিমানের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে আদায়কৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু তদন্তে সেই অর্থের কোনো হিসাব না পাওয়ায় রাজস্ব আত্মসাতের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, আদায়কৃত অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না হয়ে অন্যত্র চলে গেছে।
তবে বিস্ময়করভাবে, তদন্তে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও ব্যাগেজ চুরির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং তদন্তের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাজাহান (পি-৩৬৪৮৯) দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটিতে একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রেখেছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে তিনি তার স্ত্রী শামিমা পারভীনকে গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন। পরে তাকেও কুয়েত স্টেশনেই পদায়ন করা হয়।
একই বিদেশি স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে দায়িত্ব পালনকে বিমানের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. শাজাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ‘নামাজে যাচ্ছেন’ বলে কথা বলতে অপারগতার কথা জানান। পরে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে ‘কিছু জানেন না’ বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য স্বীকার করা হলেও কারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে সরকারি রাজস্ব হারিয়ে গেল—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দায় নির্ধারণ না করায় পুরো তদন্তই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের বিদেশি স্টেশনগুলোতে যদি এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিমানের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্র ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করবে।
