রাজউকে ‘ডার্ক জোন’ ! ঘুষ-অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রে পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়া : আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, পছন্দের পরিদর্শক দিয়ে ‘এরিয়া নিয়ন্ত্রণ’—মহাখালী জোনে ‘ঘুষের টেকসই ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে প্রশ্ন ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  পরিকল্পিত রাজধানী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক। নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই রাজউকেরই বিভিন্ন জোনে ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কথিত নিয়ন্ত্রণে রাজউকের কোনো কোনো জোনে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ‘অন্ধকার প্রশাসনিক বলয়’। আর এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রাজউকের পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়ার নাম।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট বলয়কে সুবিধা দেওয়া, পছন্দের নির্মাণ পরিদর্শকদের গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া এবং তাদের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী বলয়ের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নথিভিত্তিক যাচাই জরুরি। অভিযোগের বিষয়ে সালেহ্ আহমদ জাকারিয়ার বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।


বিজ্ঞাপন

মহাখালী জোনে ‘ঘুষের টেকসই ম্যানেজমেন্ট’ ?  রাজউকের মহাখালী জোনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ জোনের কিছু নির্মাণ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগের পরিবর্তে অনুমোদন, নকশা, নির্মাণসংক্রান্ত ফাইল ও পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইলের গতি থামিয়ে রাখা, বিভিন্ন ধরনের আপত্তি তোলা কিংবা অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। পরে কথিত ‘ম্যানেজমেন্ট’-এর মাধ্যমে সেই জটিলতা কাটানোর পথ তৈরি হয় বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা কেবল বিচ্ছিন্ন দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং একটি পরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত বহন করে।

পছন্দের পরিদর্শক’ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ  : অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়া তার পছন্দের কিছু পরিদর্শককে তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ও বড় ‘এরিয়া’তে দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব পদায়নে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি আর্থিক স্বার্থের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কথিত ঘুষ বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। এমনকি রাজউকের জোন-৬/১-এ দায়িত্ব পালনের সময় অথরাইজড অফিসার জোটন দেবনাথ এবং সহকারী অথরাইজড অফিসার পলাশ সিকদারকে দিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের পদায়ন আদেশ, দায়িত্ব বণ্টনের নথি, ফাইলের গতিপথ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

হামলার ঘটনায় ‘ধামাচাপা’র অভিযোগ  : রাজউকের কথিত এই বলয়কে ঘিরে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ এক সংবাদকর্মীর ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় মো. সোলাইমান হোসেনের নাম উঠে আসে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দৃশ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, ঘটনার শুরুতে পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়া বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘তেমন কিছু নয়’—এমন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে, তারপরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—সে প্রশ্ন এখনো রয়েছে। এখানেও প্রয়োজন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, অভিযোগের রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ  :
রাজউকের এই কথিত প্রশাসনিক বলয় নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা ছিল কি না।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়া একটি নির্দিষ্ট বলয় পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে শুধু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে ‘ফ্যাসিবাদী’ বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারি নথি, পদায়ন ও পদোন্নতির ইতিহাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন যাচাই।

বিলাসী জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন   : পেশাগত অভিযোগের পাশাপাশি পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়ার ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিজাত ক্লাব, লাউঞ্জ ও বারকেন্দ্রিক যাতায়াত এবং বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে নানা দাবি রয়েছে। তবে এসব ব্যক্তিগত দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—তার ঘোষিত আয়, সম্পদ, ব্যয় ও জীবনযাপনের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। প্রয়োজনে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন এবং বৈধ আয়ের উৎস আইনানুগ প্রক্রিয়ায় যাচাই করা যেতে পারে।

ডার্ক জোন’ ভাঙবে কে ? রাজউকের মতো একটি রাষ্ট্রীয় নগর উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে যদি ঘুষ, প্রভাব বিস্তার, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পদায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কোনো একক কর্মকর্তার বিষয় নয়।

এটি রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে মহাখালী জোনে ফাইল আটকে রাখা, পরিদর্শন ও অনুমোদনকে ঘিরে অর্থ আদায়, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া এবং অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগগুলো এখন তদন্তের দাবি রাখে।

সামনে যেসব প্রশ্ন   :  মহাখালী জোনে কি সত্যিই কোনো সংগঠিত ‘ঘুষ সিন্ডিকেট’ সক্রিয় ? কোন কর্মকর্তা কোন ‘এরিয়া’ নিয়ন্ত্রণ করেন ? গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে ? জোন-৬/১-এ দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান মহাখালী জোনের কোনো যোগসূত্র আছে কি ?
৩০ জানুয়ারি ২০২৫-এর হামলার ঘটনায় প্রশাসনিকভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ?

অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা অভিযোগ নিষ্পত্তির কোনো নথি রয়েছে কি ? আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রভাবশালী বা সুবিধাভোগী কোনো বলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগাযোগ বা প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ আছে কি ? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়-সম্পদ ও জীবনযাপনের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি ?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন পদায়ন আদেশ, দায়িত্ব বণ্টনের নথি, অনুমোদন ফাইল, অভিযোগের রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, সম্পদ বিবরণী এবং আইনসম্মত আর্থিক তথ্যের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা রাজউকের পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়ার বক্তব্যও পাঠকের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি এসব অভিযোগকে কীভাবে দেখছেন, তার ব্যাখ্যা কী—তা জানার পরই পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

রাজউকের মহাখালী জোনে কথিত এই ‘ডার্ক জোন’ যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে সেটি ভাঙার দায়িত্ব কেবল কোনো এক ব্যক্তির নয়; বরং রাজউকের প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমনকারী সংস্থার। অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।

অভিযোগের নেপথ্যে কারা ? কোন কর্মকর্তা কোন ‘এরিয়া’ নিয়ন্ত্রণ করেন ? জোন-৬/১-এর পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে মহাখালী জোনের বর্তমান ব্যবস্থার যোগসূত্র কোথায় ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন আরও নথি, তথ্য ও অনুসন্ধান।

👁️ 36 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *