দৃষ্টি এবার তৃণমূলে

এইমাত্র জাতীয় রাজনীতি

বিশেষ প্রতিবেদক : তৃণমূল নেতাদের আন্দোলনের ফসল দেশের গণতন্ত্র। আর সে গণতন্ত্র ফিরে পাওয়াতেই সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এমনটাই মনে করেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার ফলে গত ১২ বছর ধরে দলে বঞ্চনার শিকার তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের খুঁজছেন দলীয় প্রধান। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করে মনোকষ্ট দূর করা হবে বলে জানিয়েছেন একাধিক সিনিয়র নেতা। সামনের পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ বাদ পড়বেন বলে আগাম ইঙ্গিত মিলেছে একাধিক সুত্রে।
সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ডিসেম্বরে পৌরসভা ও আগামী বছর মার্চে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সে নির্বাচনগুলোতে মনোনয়ন দিয়ে দলটির প্রাণশক্তি তৃণমূলে প্রাণের সঞ্চার ঘটাবেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। শূন্য হওয়া পাঁচটি আসনের উপনির্বাচনে দীর্ঘদিন বঞ্চিত নেতাদের মনোনয়ন দিয়ে তিনি তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন। আর আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যাঁরা নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত ছিলেন, দলের দুর্দিনে যাঁরা ত্যাগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন, আজ তাঁরাই নিপতিত হয়েছেন চরম দুর্দিনে। ক্ষমতাবান, সুবিধাভোগী আর স্বার্থবাজ নেতারা তাঁদের দূরে ঠেলে রেখেছেন। দলীয় কর্মকা-েও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তাঁরা। সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি-মন্ত্রীরাও মুখ ফিরিয়ে রাখেন; কাছে ভিড়তে দেন না। এমপি-মন্ত্রীদের ঘিরে রাখেন নব্য সুযোগসন্ধানী নেতারা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী রাজনীতির ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে অধিকাংশ স্থানে।
জানা গেছে, নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা দলে কোণঠাসা আর ভুঁইফোড় সুবিধাভোগীরা বিপুল দাপটে; অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতায় তাঁরা পরিপুষ্ট। আর ত্যাগীরা বঞ্চিত-নিপীড়িত; তাঁদের মুখে শুধুই হতাশার সুর। বিভিন্ন কমিটিতে ক্ষমতাসীনরা দুর্নীতি-অনিয়মে আকণ্ঠ নিমজ্জিত; তাই দেখে নিবেদিতপ্রাণ নেতারা প্রতিবাদ করতে গিয়ে হচ্ছেন নির্যাতিত। তাঁদের অনেকে ক্ষোভে-দুঃখে দলীয় কর্মকা- থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন; কেউ কেউ আবার অন্য দলেও যোগ দিয়েছেন। এই অবস্থা আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোতেও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কমপক্ষে ২৫টি জেলায় দলীয় রাজনীতি নব্য আওয়ামী লীগারদের দখলে চলে গেছে। তাদের দাপটে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় রাজপথে থাকা ত্যাগী, নির্যাতিত ও কর্মীবান্ধব নেতারা এখন কোণঠাসা। দেশের ৬৪টি জেলার বিভিন্ন কমিটিতেই এই অবস্থা বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সুযোগসন্ধানীদের তৎপরতার কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত তৃণমূল আওয়ামী লীগ। উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতাদের মধ্যে দলীয় আদর্শের ছিটেফোঁটাও নেই। ছলে-বলে-কৌশলে, কখনো চাটুকারিতা করে তাঁরা দলীয় পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। অনেক এলাকায় এমপি-মন্ত্রীর পিএস, এপিএস আর তাঁদের আত্মীয়স্বজনই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। অনেকে বড় পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়েছেন। তাঁরাই এখন মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রদের ঘনিষ্ঠজন। অনেক জায়গায় আবার বিএনপি-জামায়াত থেকে আগত নেতারাই দলে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের শেকড় মাটির অনেক গভীরে উল্লেখ করে এ বিষয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস দেশের জনগণ। মাটি ও মানুষের দল হিসেবে জনমানুষের বুকের গভীরে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ঠাঁই করে নিয়েছে। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি দুর্যোগ ও সংকটে গত ৭০ বছর ধরে জনগণের পাশে থেকেছে আওয়ামী লীগ, তাই যারা মনে করেন আওয়ামী লীগের অবস্থান তাসের ঘরের মতো, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আওয়ামী লীগ তাসের ঘর নয় যে, টোকা লাগলে পড়ে যাবে।
এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, খোঁজ নেওয়া হচ্ছে সত্যিকার ত্যাগী কারা কারা, বঞ্চিত এবং সুবিধাবাদী কারা। সেই তালিকা করে বঞ্চিতদের মূল্যায়ন ও সুবিধাবাদীদের বাদ দেওয়া হবে এমন একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেন, প্রায় আড়াইশ পৌরসভা ও সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নেতাকর্মীবেষ্টিত নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সুবিধাবাদী ও কর্মীবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দূর হবে এবং দলে ভারসাম্য ফিরে আসবে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, আগামীতে দলের সব পর্যায়ে ত্যাগী, সৎ, কর্মীবান্ধব নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি হাইব্রিড, সুযোগসন্ধানী ও দুর্নীতিবাজদের বাদ দেওয়া হবে। উড়ে এসে জুড়ে বসাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান থাকবে এটা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ। শুধু পৌর বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনই নয়, দলের সবস্তরে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে।
সারা দেশে আওয়ামী লীগের পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে জানা গেছে, এবার তৃণমূলের পাঠানো পূর্ণাঙ্গ কমিটি থেকে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে দেবে কেন্দ্র। ইতোমধ্যে বিতর্কিত নেতাদের একটি তালিকা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা যেনো কোনোভাবে পদ না পায়, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের দপ্তর সেলে জমা দিতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় নেতারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা খতিয়ে দেখে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ ও যাচাইবাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত, দলের দুর্দিনে যারা ত্যাগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাদের মূল্যায়ন করতে চান শেখ হাসিনা।
দলীয় সূত্র জানায়, গত সাড়ে ১১ বছরে কিছু এমপি-মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে সারা দেশে জামায়াত-বিএনপির অর্ধলক্ষাধিক নেতা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে পদ-পদবি পেয়েছেন। অবশ্য এর বিনিময়ে তাদের গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উপকমিটির সহসম্পাদকের তালিকায় নাম লেখাতে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়েছে। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় একাধিক স্থানীয় যুবলীগ নেতার নাম চলে এসেছে। যদিও ঐ উপজেলার যুবলীগের আহ্বায়ক ১০ লাখ টাকা দিয়ে নেতা হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২৭ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে যুবলীগ থেকে। ফরিদপুর ও সাতক্ষীরা জেলা যুবলীগের কমিটির কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অন্তর্গত ২০ নম্বর ওয়ার্ড কমিটিও স্থগিত। সবশেষ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়কসহ তিন জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগও। চাঁদাবাজির দায়ে অপসারিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এক শীর্ষ নেতা ৪০ লাখ টাকায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদকের পদ বিক্রি করেছেন বলে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই জেলা ও মহানগর নেতারাও। আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩৬টি জেলায় সম্মেলন হয়েছে। শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিয়ে এসব শাখা কমিটি চলছে। এবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গিয়ে অধিকাংশ জেলা শাখার শীর্ষ নেতারা পদবাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, পদবাণিজ্য করার কোনো সুযোগ নেই। জেলা-মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কাদের রাখতে হবে সে ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে গাইডলাইন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা কমিটিতে থাকতে পারবেন না। বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারীদের কোনো পদে রাখা যাবে না। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, কমিটিতে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


বিজ্ঞাপন
👁️ 102 News Views