
গণপূর্তের রমনা স্টোর এর রাস্তা নির্মাণ কাজের ছবি –সংগৃহীত।

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের রমনা স্টোর কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরীণ রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্ময়কর দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে ‘উন্নত মানের বিটুমিনাস কার্পেটিং ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ’ প্রতিষ্ঠার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে প্রশংসামূলক প্রতিবেদনে।
অন্যদিকে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, প্রকৌশলী–ঠিকাদার আঁতাত এবং বরাদ্দের অর্থ ভাগবাটোয়ারার গুরুতর অভিযোগ। এই দুই বিপরীত বয়ানের সংঘাতে প্রশ্ন উঠছে—রমনা স্টোরে আসলে উন্নয়ন হয়েছে, নাকি উন্নয়নের আড়ালে সংগঠিত হয়েছে দুর্নীতি?

প্রশংসামূলক প্রচারণা ও ‘দুর্নীতিমুক্ত গণপূর্তের’ গল্প : একটি প্রোপাগাণ্ডামূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরে নাকি আমূল পরিবর্তন এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় রমনা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১, শাখা-২ (রমনা স্টোর)-এর অভ্যন্তরীণ রাস্তা গড় ৩ ইঞ্চির বেশি পুরু বিটুমিনাস কার্পেটিং, ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম এবং উন্নতমানের রেডি মিক্স ব্যবহারে নির্মিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এই প্রতিবেদনে উপ-সহকারী প্রকৌশলী খন্দকার মমিনুর রহমান ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ মেহবুবার রহমান-এর ‘সততা, দক্ষতা ও তদারকির’ ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। এমনকি বলা হয়, যারা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন—তারা নাকি “মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা” চালাচ্ছেন।
কিন্তু এই প্রশংসাবাণীর ভাষা ও ধরন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এটি একটি মোসাহেবি ও তোষামোদমার্কা প্রচারণা, যেখানে প্রকল্পের বাস্তব কারিগরি মানের চেয়ে ব্যক্তিবন্দনই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ : এর বিপরীতে, গত ২৪ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রমনা স্টোর কম্পাউন্ডের সড়ক নির্মাণে নির্ধারিত কারিগরি বিধি অনুসরণ করা হয়নি।
যেখানে মাটি খনন করে বড় ইটের খোয়া, বালু, ডাউন পাথর ও রোলার কম্প্যাকশন দিয়ে ভিত্তি প্রস্তুতের কথা, সেখানে পুরোনো রাস্তা সামান্য ঘষেমেজে পরিষ্কার করে শুধু ডাস্ট পাথরের ওপর পাতলা কার্পেটিং করা হয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে শ্রমিকরাও স্বীকার করেছেন, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশেই কাজ করছেন। কোথাও বড় পাথর বা সঠিক বেস লেয়ারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রকৌশলী–ঠিকাদার আঁতাতের অভিযোগ : একাধিক প্রকৌশলীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়— বরাদ্দকৃত অর্থ ভাগবাটোয়ারার উদ্দেশ্যেই নিম্নমানের কাজ করানো হচ্ছে, যাতে এক বছর পর আবার রাস্তা ভেঙে নতুন বরাদ্দ আনা যায়। অর্থাৎ এটি একটি চক্রাকার দুর্নীতি মডেল—নিম্নমানের কাজ → দ্রুত ক্ষয় → নতুন বরাদ্দ → আবার অর্থ লোপাট।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : এই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারিন ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আহমেদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি নাকি “প্রকৌশলীদের নির্দেশনা অনুসরণ করেই” কাজ করছেন। অর্থাৎ দায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে প্রকৌশলীদের ঘাড়ে।
দায়সারা বক্তব্যে প্রশাসনিক গাফিলতি : উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত খন্দকার মমিনুল ইসলাম জানান, তিনি ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ বুঝে নিচ্ছেন—এর বেশি কিছু জানেন না।
অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম জানান, তিনি নাকি বিষয়টি জানেন না ; সরেজমিন পরিদর্শনের পর ব্যবস্থা নেবেন। এই বক্তব্যগুলো প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়ানোর পরিচায়ক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন উঠছে কার স্বার্থে দুই বিপরীত প্রতিবেদন ? একদিকে জাতীয় দৈনিকে দুর্নীতির তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান। অন্যদিকে হঠাৎ আবির্ভূত প্রশংসামূলক প্রতিবেদন, যেখানে নির্দিষ্ট প্রকৌশলীদের সততা ও দক্ষতার বন্দনা করে দুর্নীতির অভিযোগকে ‘মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা’ বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি ক্লাসিক কভার-আপ কৌশল—
দুর্নীতির অভিযোগ চাপা দিতে মোসাহেবি ও তোষামোদমূলক প্রচারণা চালানো।
সারসংক্ষেপ : রমনা গণপূর্ত স্টোরের রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্প এখন শুধুই একটি নির্মাণকাজ নয়— এটি পরিণত হয়েছে প্রকৌশলী–ঠিকাদার আঁতাত, নিম্নমানের নির্মাণ, বরাদ্দ লোপাট এবং প্রপাগাণ্ডামূলক কভার-আপের একটি সম্ভাব্য দুর্নীতি কেসে। স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। নইলে ‘উন্নত কার্পেটিং’-এর গল্পের আড়ালেই চাপা পড়ে যাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের বাস্তবতা।
