এলবিয়নের ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধে বাজার সয়লাব : স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে জনসাধারণ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত চট্টগ্রাম জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ স্বাস্থ্য

# মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক # পানিতে না গলা ট্যাবলেট, # আন্ডাররেটে বাজার—প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন # DGDA-র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ # চট্টগ্রামে বিতর্কিত কয়েক কোম্পানিকে ‘ছায়া সুরক্ষা’ #


বিজ্ঞাপন
এলবিয়নের চেয়ারম্যান মো : রাইসুল ইসলাম সৈকত, ডাইরেক্টর মো: সাকিব হাসান এবং এমডি মো : নিজাম উদ্দিন।

 

নিজস্ব প্রতিবেদক  : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের রহমতনগরে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড আবারও নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল, নিম্নমানের এবং মানবহির্ভূত ঔষধ উৎপাদন ও আন্ডাররেটে বাজারজাত করার গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর ভূমিকা নিয়েও।

অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, মূল্য নির্ধারণ কমিটি এবং ব্ল্যাকলিস্ট অনুমোদন কমিটির প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গে অবৈধ সমঝোতার মাধ্যমে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ বছরের পর বছর বাজারে নিম্নমানের ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

এতে দেশের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।  প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১।


বিজ্ঞাপন

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ‘ছদ্মবেশ’—এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’  : অভিযোগ অনুযায়ী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ট্যাবলেট ডিসপ্রিনের আদলে এলবিয়ন ‘এসপ্রিন’ নামে একটি ট্যাবলেট বাজারে দাপিয়ে বিক্রি করছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্য কোনো কোম্পানি যখন নিষিদ্ধ এই ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে না, তখন এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ এককভাবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি— ডিসপ্রিনের মতো পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার কথা থাকলেও এলবিয়নের এসপ্রিন ট্যাবলেট পানিতে ঠিকভাবে গলে না, যা ওষুধটির মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এলবিয়ন ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড এর আন্ডার রেটে বাজারজাত করা ঔষধ সামগ্রীর ছবি।

 

লেবেলে এক দাম, বাজারে আরেক ! অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এলবিয়নের উৎপাদিত বহু ওষুধের লেবেলে মুদ্রিত দাম এবং পাইকারি বাজারে বিক্রির দামের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো— ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা) এমএ নং: ০৯৬-৯৩-০১৪ লেবেল মূল্য: ২০০ টাকা বাজারে বিক্রি: মাত্র ৬৫ টাকা , প্যানটোপ্রাজল-২০ এমএ নং: ০৯৫-১২৯-০৬৭  লেবেল মূল্য: ২১০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৭০ টাকা  ডাইক্লোফেনাক এসআর (১০০ মি.গ্রা) এমএ নং:০৯৬-১১০-০৬৪ লেবেল মূল্য: ৩০০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৯০ টাকা, সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা,  লেবেল মূল্য: ২৫০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৭০ টাকা,  ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা লেবেল মূল্য: ৪০০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৯৫ টাকা,  ডেক্সামেথাসন ০.৫ মি.গ্রা লেবেল মূল্য: ২০০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৬৫ টাকা,  ক্যালসিয়াম-ডি  লেবেল মূল্য: ৩৬০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৯৫ টাকা, লটিল-২০ (ওমেপ্রাজল) লেবেল মূল্য: ৪০০ টাকা বাজারে বিক্রি: ১০০–১১০ টাকা, লটিল-৪০ লেবেল মূল্য: ২৪০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৯০ টাকা, নাইট্রাম (নাইট্রাজেপাম ৫ মি.গ্রা)  লেবেল মূল্য: ১০০ টাকা বাজারে বিক্রি: ৩০ টাকা,  টলসিড (টনফেনামিক এসিড) লেবেল মূল্য: ২৪০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ১১০–১২০ টাকা,  ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস-৫০০, লেবেল মূল্য: ৩৬০ টাকা বাজারে বিক্রি: ১৪০–১৫০ টাকা।

অভিযোগকারীরা জানান, এসব ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার হাজী রানী মেডিসিন মার্কেটের পাইকারি দোকান থেকে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— এত কম দামে ওষুধ বাজারজাত হওয়া মানেই উৎপাদন প্রক্রিয়া, কাঁচামাল অথবা মান নিয়ন্ত্রণে গুরুতর সমস্যা রয়েছে।

ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরিক্ষায় নিম্নমানের বিবেচিত হওয়া আলোচিত ও সমালোচিত সেই ঔষধের নমুনার ছবি।

 

ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের ভয়ংকর প্রতিবেদন  : ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিস্ময়কর তথ্য। চট্টগ্রামের এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের তৈরি মিমক্স ৫০০ মি.গ্রা ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন একটুও পাওয়া যায়নি। (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক) সরকারি বিশ্লেষক ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ (বর্তমানে অবসরে আছেন) তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন— পরীক্ষিত নমুনায় অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি। ফলে এটি মানবহির্ভূত। শুধু তাই নয়, ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলেও ঘোষিত মাত্রার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।

একই ভবনে পশু ও মানুষের ওষুধ !  উপরের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এলবিয়নের কারখানায় পশু ও মানুষের ওষুধ একই ভবনে উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার GMP (Good Manufacturing Practice) নীতিমালা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আগেও সিলগালা হয়েছিল কারখানা  : মানবহির্ভূত ওষুধ তৈরির অভিযোগে একসময় চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকায় এলবিয়নের কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করে। পরে সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৮ ও ২০০৯ সালেও উৎপাদন স্থগিত  : ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী— ২০০৮ সালে এলবিয়নের উৎপাদিত

ডাইক্লোফেনাক টি-আর, ডক্সিসাইক্লিন, গ্লাইসোফুলভিন এবং আইবুপ্রোফেন, এই চারটি ওষুধের উৎপাদন, মজুদ ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়। ২০০৯ সালে আবারও পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় সেটিও স্থগিত করা হয়।

প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন : একাধিক গুরুতর অভিযোগ, মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, GMP লঙ্ঘন, কারখানা সিলগালা—সব ঘটনার পরও এলবিয়ন কীভাবে বছরের পর বছর উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন স্বাস্থ্যখাতে বড় আলোচনার বিষয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— “ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যদি সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে নিম্নমানের ওষুধ বাজারে ছড়াত না।”

দুর্নীতির অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ সুবিধা নিয়ে এলবিয়নসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি বিতর্কিত কোম্পানিকে ‘ছায়া সুরক্ষা’ দিচ্ছেন। ফলে, নিম্নমানের ওষুধ, মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, সন্দেহজনক উৎপাদন, সবকিছু চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি  :  স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন— নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের মতে—“এলবিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে দেশের জনস্বাস্থ্য বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।”

👁️ 89 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *