
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩—যে দপ্তর হওয়ার কথা ছিল সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে “কাগুজে উন্নয়ন আর বাস্তব লুটপাটের” এক ভয়ংকর কেন্দ্রে—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি প্রভাবশালী চক্র—
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক, নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার ইবনে সাঈখ এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ—যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে সুসংগঠিত দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ।
বাজেট শেষের নামে ৪ কোটি টাকার ‘অদৃশ্য ব্যয় ’ : ২০২১–২০২২ অর্থবছরে, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কায়সার ইবনে সাঈখ অসম্পূর্ণ ও অকর্মণ্য কাজের বিপরীতে ৪ কোটির বেশি টাকার বিল অনুমোদন করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থ ছিল ঢাকা জোনে তড়িঘড়ি করে খরচ করা প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিতর্কিত ব্যয়ের অংশ। প্রশ্ন উঠেছে: কাজ ছাড়া বিল—এই টাকা গেল কোথায় ?

ভুয়া সংস্কার: প্রকল্প আছে, কাজ নেই : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একের পর এক “কাগুজে সংস্কার” প্রকল্প— তেজগাঁও ল্যান্ড রেকর্ডস অফিস (বাংলো-১) ও সেন্ট্রাল রেকর্ড ভবনে, ১৯.৮৭ লাখ টাকার সংস্কার অনুমোদন (৫ জুন), বাস্তবে: কোনো কাজ হয়নি, এনবিআর ভবন (সেগুনবাগিচা) ও অডিট কমপ্লেক্স, ১৬ মে মেরামত ও রংকরণের অনুমোদন, মাঠপর্যায়ে: দেয়াল ক্ষয়িষ্ণু, কাজের চিহ্ন নেই, এগুলো কি শুধুই অবহেলা—নাকি পরিকল্পিত অর্থ আত্মসাৎ?

৫% কমিশন সিন্ডিকেট’—অভিযোগে দুই শীর্ষ কর্মকর্তা
ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমপক্ষে ৫% কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে— যেখানে নেতৃত্বে ছিলেন: সতীনাথ বসাক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), কায়সার ইবনে সাঈখ (নির্বাহী প্রকৌশলী), অভিযোগ অনুযায়ী, এই কমিশনের বিনিময়ে—অসম্পূর্ণ কাজের বিল পাশ এবং কাজ না করেই অর্থ উত্তোলনের সুযোগ।
নিজের অফিসে ২১ লাখ টাকার ‘বিলাস সংস্কার’ : একদিকে সরকারি ভবন জরাজীর্ণ, অন্যদিকে— নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজের অফিসে ২১ লাখ টাকার ব্যয়, বারবার টাইলস ও মার্বেল পরিবর্তন, মাত্র ১০ মাস আগে বসানো টয়লেট ফিটিংস আবার পরিবর্তন এটি প্রয়োজনীয়তা—নাকি “অর্থ লোপাটের কৌশল”?—এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
ই-জিপি পাশ কাটিয়ে ম্যানুয়াল টেন্ডার : নথিপত্রে দেখা গেছে— ই-জিপি টেন্ডার থাকা সত্ত্বেও ম্যানুয়ালি NOA দিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে এটি সরাসরি সরকারি ক্রয় বিধিমালার লঙ্ঘন—এমন মত সংশ্লিষ্টদের।
হাসপাতাল ও মসজিদ প্রকল্পে ‘ঘুষের রেট’ নির্ধারণের অভিযোগ : ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে— ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প ৩ কোটি টাকার বিল ছাড়াতে ১০% কমিশন দাবি,, ৩টি মডেল মসজিদ প্রকল্প, ১.২ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ , ফলাফল (অভিযোগ অনুযায়ী): টাইলস খসে পড়া, পাইপ লিক, লিফট বিকল এবং OT-এর AC অকেজো , এতে জননিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
ফিরোজ আহমেদ: মাঠপর্যায়ের ‘ম্যানেজার’ ? : সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—সাইট ভিজিট রিপোর্টে মিথ্যা তথ্য প্রদান, কাজের পরিমাপে জালিয়াতি এবং অসম্পূর্ণ কাজকে ‘সম্পূর্ণ’ দেখানো। অর্থাৎ, পুরো সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী হিসেবেই তার নাম উঠে এসেছে।
হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা করে প্লট হস্তান্তর ! ২০২৩ সালে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ৬০ কাঠা প্লট (নং-২৬৬)— হাইকোর্টের ২০১৭ সালের রায়ে দলিল বাতিল ও স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও কায়সার ইবনে সাঈখ মালিকানা হস্তান্তরের সুপারিশ করেন, বর্তমানে এই বিষয়ে ৩টি মামলা চলমান।
তদন্ত হলো, শাস্তি হলো না ! : ২০১৯ সালে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি— দুর্নীতির প্রমাণ পায়, শাস্তির সুপারিশ করে, কিন্তু বাস্তবে—কোনো শাস্তি হয়নি, বরং “প্রাইজ পোস্টিং” ঝিনাইদহ → চাঁদপুর → ঢাকা, এই ঘটনাই এখন প্রশাসনের ভেতরে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বড় প্রশ্নগুলো এখনো উত্তরহীন : দুদকের তদন্ত কোথায় থেমে গেল? মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ কারা আটকে দিল ? এই সিন্ডিকেটের পেছনে কারা রয়েছে ? প্রমাণ থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় কার ?
উপসংহার : একটি দপ্তর, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের মডেল?
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এখন যেন—“প্রকল্প আছে, বিল আছে—কাজ নেই” মডেলের প্রতীক , যেখানে অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম ভেঙে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতি নেটওয়ার্ক। সচেতন মহলের দাবি—নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা
